বর্তমানে পিঠ বা কোমরের ব্যথা (ব্যাক পেইন) একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, কায়িক শ্রমের অভাব এবং ভুল জীবনযাত্রার কারণে ছোট-বড় প্রায় সবাই এই সমস্যায় ভুগছেন। খেলাধুলার চোট থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন রোগের কারণে এই সমস্যা হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং সচেতনতার সাথে এই ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব। কালবেলার পাঠকদের জন্য ব্যাক পেইন কমানোর সহজ ৮টি উপায় নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, আমাদের শরীরের ‘কোর মাসল’ বা কেন্দ্রের পেশিগুলো শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের শরীরের উপরিভাগের পুরো ওজন বহন করে নিচের দিকের পিঠ বা কোমর। তাই মেরুদণ্ডকে সঠিক ভার বহনে সহায়তা করতে এর চারপাশের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে এই পেশিগুলো খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। ফলে পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেরুদণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু কোর-স্ট্রেন্থেনিং ব্যায়ামের মাধ্যমে এই পেশিগুলোকে সচল ও শক্তিশালী রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন নিয়ম করে স্ট্রেচিং করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা ‘মাসল স্টিফনেস’ পিঠের ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। পেশি যদি নমনীয় না থাকে, তবে তা মেরুদণ্ড ও হাড়ের সংযোগস্থলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডিস্কের ক্ষতি করতে পারে। সুস্থ ও নমনীয় মেরুদণ্ডের জন্য প্রতিদিন সকালে বা কাজের ফাঁকে যোগব্যায়াম বা সাধারণ স্ট্রেচিং করার অভ্যাস করা উচিত। এটি রক্ত সঞ্চালন বাড়াতেও সাহায্য করে।
তৃতীয়ত, বসার সঠিক ভঙ্গিমা বা ‘পোশ্চার’ ঠিক রাখা জরুরি। দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্কের ওপর কয়েক গুণ বেশি চাপ পড়ে। বিশেষ করে যারা ডেস্কে কাজ করেন, তাদের অবশ্যই পিঠ সোজা রেখে বসা উচিত। একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর অন্তত পাঁচ মিনিটের জন্য উঠে হাঁটাচলা করা বা শরীর স্ট্রেচ করা মেরুদণ্ডের ক্লান্তি দূর করতে সহায়ক।
চতুর্থ উপায় হলো নিয়মিত হাঁটা। হাঁটা শরীরের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ, সহজ এবং কার্যকর একটি ব্যায়াম। নিয়মিত দ্রুত গতিতে হাঁটলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি কেবল পিঠের ওপর থেকে বাড়তি চাপের ঝুঁকি কমায় না, বরং মেরুদণ্ডের হাড়কে মজবুত রাখতেও সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন।
পঞ্চম বিষয়টি হলো ভারি বস্তু তোলার সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা। অনেকেই হঠাত করে নিচু হয়ে ভারি কিছু তুলতে গিয়ে মেরুদণ্ডে বড় ধরণের চোট পান। ভারি কোনো কিছু তোলার সময় ভুলভাবে শরীর মোচড় দিলে পেশিতে টান লেগে তীব্র ব্যথা হতে পারে। কোনো কিছু তোলার সময় কোমর বাঁকা না করে বা পিঠের ওপর চাপ না দিয়ে পায়ের পেশির শক্তি ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে হাঁটু গেড়ে বসে বস্তুটি তুলুন এবং অবশ্যই সামর্থ্যের বাইরে হলে অন্যের সাহায্য নিন।
ষষ্ঠত, ঘুমানোর সঠিক ভঙ্গি নিশ্চিত করা। আমরা জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় ঘুমিয়ে কাটাই, তাই এই সময়ে মেরুদণ্ডের অবস্থান কেমন থাকছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একেবারে সোজা হয়ে চিৎ হয়ে ঘুমালে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বক্রতায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই চিৎ হয়ে ঘুমানোর সময় হাঁটুর নিচে একটি পাতলা বালিশ দিয়ে পা কিছুটা উঁচু করে রাখুন। আর যদি আপনি কাত হয়ে ঘুমান, তবে দুই হাঁটুর মাঝে একটি বালিশ রাখুন। এতে মেরুদণ্ড সমান্তরাল থাকে এবং পিঠের ওপর চাপ কমে।
সপ্তম উপায় হলো ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। শরীরের বাড়তি ওজন, বিশেষ করে পেটের চর্বি পিঠের পেশি ও মেরুদণ্ডে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে মেরুদণ্ড একদিকে হেলে যেতে পারে বা হাড়ের স্বাভাবিক বক্রতা নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা ডিস্ক হার্নিয়েশনের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পিঠ ভালো রাখতে সুষম খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
সবশেষে, ধূমপান ত্যাগ করা। অনেকে অবাক হতে পারেন, কিন্তু ধূমপানের সাথে ব্যাক পেইনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ধূমপান মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলোতে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়, ফলে ডিস্কগুলো প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না এবং দ্রুত ক্ষয় হতে থাকে। এ ছাড়া ধূমপানের কারণে শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যায় এবং নতুন হাড় গঠন ব্যাহত হয়, যা অস্টিওপরোসিসের মতো হাড়ের রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে পিঠের ব্যথা প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও, আঘাত বা বড় কোনো চোটের কারণে ব্যথা তীব্র হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
