রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি: কেন বাড়ছে এই মরণব্যাধি?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০১:৪২ এএম

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি: কেন বাড়ছে এই মরণব্যাধি?

কোলন ক্যানসার একসময় মূলত পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হতো। চিকিৎসকরাও সাধারণত বয়স্কদের এই রোগের ব্যাপারে স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার পরামর্শ দিতেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে তরুণদের মধ্যে এই ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মাত্র ত্রিশ বা চল্লিশের কোঠায় পা দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এই মরণব্যাধি শনাক্ত হচ্ছে, যা কয়েক দশক আগেও ছিল বিরল। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকের পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মের মধ্যে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং মলাশয় বা রেকটাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৯ লাখ ৩০ হাজার জন। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, যদি বর্তমান জীবনযাত্রা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন না আসে, তবে ২০৪০ সালের মধ্যে এই আক্রান্তের সংখ্যা বছরে ৩২ লাখ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৬ লাখে পৌঁছাতে পারে। তরুণদের মধ্যে এই রোগের বিস্তারের পেছনে জিনগত কারণের চেয়ে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাকেই বেশি দায়ী করছেন গবেষকরা। তবে আশার কথা হলো, সঠিক সচেতনতা এবং পাঁচটি মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।

কোলন ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের প্রথম ও প্রধান ধাপ হলো অ্যালকোহল বা মদ্যপান বর্জন করা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি প্রমাণিত যে, মদ্যপান অন্তত সাত ধরণের ক্যানসারের ঝুঁকি সরাসরি বাড়িয়ে দেয়। অ্যালকোহল শরীরের কোষে বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে যা ডিএনএ-র ক্ষতি করে এবং কোলনে ক্যানসার কোষের জন্ম দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী মদ্যপানের ফলে এই ঝুঁকি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে যেকোনো ধরণের অ্যালকোহল পরিহার করা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে। তামাকজাত দ্রব্য বিশ্বব্যাপী ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থগুলো রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে কোলনে পৌঁছে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। যারা দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করেন, তাদের মধ্যে কোলন ক্যানসারের জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই সুস্থ কোলনের জন্য ধূমপান ও তামাক ব্যবহার বন্ধের বিকল্প নেই।

তৃতীয়ত, অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ করা। স্থূলতা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের সমস্যা নয়, এটি শরীরের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ (Inflammation) সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত মেদ শরীরে ইনসুলিন ও অন্যান্য হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যা ক্যানসার কোষের বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ক্যালরি মেপে খাবার গ্রহণের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কোলন ক্যানসার প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

চতুর্থত, খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনা। বর্তমান তরুণদের ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত মাংস (সসেজ, হটডগ, সালামি) এবং লাল মাংস (গরু, খাসি) খাওয়ার প্রবণতা কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। উচ্চ তাপে গ্রিল করা বা ভাজা মাংসও কোলনের জন্য ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে আঁশযুক্ত শাকসবজি, ফলমূল এবং গোটা শস্য (Whole Grains) রাখা উচিত। আঁশযুক্ত খাবার কোলন পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর টক্সিন শরীর থেকে বের করে দেয়।

পঞ্চমত, অলস জীবনযাপন ত্যাগ করে সক্রিয় হওয়া। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা কোলন ক্যানসারের অন্যতম বড় অনুঘটক। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন তাদের এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম বা প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা অল্প দূরত্বে হেঁটে যাওয়াও কার্যকর হতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে এই ‘সিটিং ডিজিজ’ বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং এই পাঁচটি নিয়ম মেনে চললে কোলন ক্যানসারের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।

banner
Link copied!