রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ঘরে বসে কিডনি পরীক্ষা: ১০ ঘণ্টার সহজ পদ্ধতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ০১:৫০ এএম

ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ঘরে বসে কিডনি পরীক্ষা: ১০ ঘণ্টার সহজ পদ্ধতি

কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ, যা অনেকটা ছাঁকন যন্ত্রের মতো কাজ করে। এটি রক্ত থেকে বর্জ্য অপসারণ, শরীরের তরলের ভারসাম্য রক্ষা এবং খনিজ পদার্থের সামঞ্জস্য বজায় রাখার মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজগুলো নিরন্তর করে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিডনিতে বড় ধরনের কোনো সমস্যা বা জটিলতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিই না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যয়বহুল ল্যাব টেস্ট ছাড়াই প্রস্রাব ত্যাগের পরিমাণ ট্র্যাক করার মাধ্যমে ঘরে বসেই কিডনির প্রাথমিক অবস্থা যাচাই করা সম্ভব। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা দীর্ঘমেয়াদী ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন, তাদের জন্য এই পরীক্ষাটি জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।

কেন প্রস্রাব পরিমাপ করা জরুরি? কিডনি সারাক্ষণ রক্ত ফিল্টার করে অতিরিক্ত বর্জ্য ও পানি প্রস্রাব হিসেবে শরীর থেকে বের করে দেয়। তাই প্রস্রাবের পরিমাণ ও হার কিডনির কার্যকারিতার একটি অন্যতম প্রাথমিক নির্দেশক। নেফ্রোলজি বা কিডনি রোগ সংক্রান্ত গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত হওয়া মানে হলো কিডনি ঠিকমতো রক্ত পরিষ্কার করতে পারছে। যদি এই প্রবাহে কোনো অস্বাভাবিক বিঘ্ন ঘটে, তবে তা কিডনি বিকল হওয়া বা অন্য কোনো গুরুতর সমস্যার সংকেত দেয়।

পরীক্ষার পদ্ধতি: ১০ ঘণ্টার নিয়ম ঘরে বসে কিডনি পরীক্ষা করার জন্য কোনো বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র একটি পরিষ্কার পরিমাপক পাত্র (Measuring cup) এবং কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। পদ্ধতিটি নিচে দেওয়া হলো: ১. দিনের এমন একটি ১০ ঘণ্টা সময় বেছে নিন যখন আপনি কোনো বিরতি ছাড়াই প্রস্রাব সংগ্রহ ও পরিমাপ করতে পারবেন। (যেমন: সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা)। ২. প্রস্রাব সংগ্রহের জন্য একটি পরিষ্কার এবং পরিমাপ নির্দেশক চিহ্ন দেওয়া অন্তত ১ লিটারের পাত্র ব্যবহার করুন। ৩. ওই ১০ ঘণ্টার মধ্যে যতবার প্রস্রাব হবে, তা সেই পাত্রে সংগ্রহ করুন এবং প্রতিটিবারের পরিমাণ যোগ করুন। ৪. ১০ ঘণ্টা শেষে মোট প্রস্রাবের পরিমাণ কত হলো তা নোট করুন এবং আপনার শরীরের ওজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা মিলিয়ে দেখুন।

হিসাব করবেন যেভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্যমতে, একজন সুস্থ মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ০.৫ থেকে ১ মিলিলিটার প্রস্রাব হওয়া স্বাভাবিক। ধরা যাক আপনার ওজন ৬০ কেজি। তবে আপনার প্রতি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৬০ মিলি প্রস্রাব হওয়া উচিত। সেই হিসাবে ১০ ঘণ্টায় আপনার মোট প্রস্রাব হওয়ার কথা ৩০০ থেকে ৬০০ মিলি। যদি আপনার প্রাপ্ত পরিমাণ এই রেঞ্জের মধ্যে থাকে, তবে বুঝতে হবে আপনার কিডনি আপাতত স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। তবে এর চেয়ে বেশি হওয়াও উদ্বেগের নয় যদি আপনি প্রচুর পানি পান করে থাকেন, কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়া বিপদের লক্ষণ।

কখন সতর্ক হতে হবে? যদি প্রস্রাবের পরিমাণ নিয়মিতভাবে প্রত্যাশিত সীমার চেয়ে অনেক কম হয়, তবে তা কিডনির অকার্যকারিতা, পানিশূন্যতা বা কিডনিতে রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। প্রস্রাবের পরিমাণের পাশাপাশি যদি নিচের উপসর্গগুলো দেখা দেয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে: ১. পা, গোড়ালি বা মুখ ফুলে যাওয়া (শরীরে পানি জমা)। ২. অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট অনুভব করা। ৩. প্রস্রাবে অত্যধিক ফেনা হওয়া বা প্রস্রাবের রঙ গাঢ় লালচে/চা-এর রঙের মতো হওয়া। ৪. ক্ষুধা মন্দা, বমি বমি ভাব বা কাজে মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া।

পরিশেষে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা মনে রাখা জরুরি; ঘরে বসে প্রস্রাব পরিমাপ করা কিডনি স্বাস্থ্যের একটি প্রাথমিক ধারণা মাত্র। এটি কখনোই পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা যেমন সিরাম ক্রিয়েটিনিন বা ইজিএফআর (eGFR)-এর বিকল্প নয়। যদি আপনি প্রস্রাবের পরিমাণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা লক্ষ্য করেন, তবে পূর্ণাঙ্গ রোগ নির্ণয়ের জন্য অবশ্যই একজন নেফ্রোলজিস্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। কিডনি রোগের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত চিকিৎসায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।

banner
Link copied!