বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশটিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ইতিমধ্যে ৫৮টিই এই সংক্রামক ব্যাধির কবলে পড়েছে। বিশেষ করে টিকার চরম ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান শিশু মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই বর্তমান পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য খাতের আগের অর্জনগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সারাদেশে ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে ২ হাজার ৯৭৩ জনের শরীরে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১৬৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১২ হাজার ৩১৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভৌগোলিক সংক্রমণের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে। দেশের আটটি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও রাজধানী ঢাকাকে সবচেয়ে বিধ্বস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ঢাকা বিভাগেই সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৩ জন। বিশেষ করে জনবহুল এলাকা ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল বস্তি, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এখন সংক্রমণের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগেও পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এই প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই এই বয়সী শিশু। এর মধ্যে আবার ৬৬ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে। সরকারি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবাই হয় কোনো টিকা পায়নি অথবা আংশিক টিকা গ্রহণ করেছিল। অর্থাৎ তারা প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৯১ শতাংশ রোগীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা দেশের একটি বিশাল সংখ্যক শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বড় ধরনের ঘাটতিকেই প্রমাণ করে।
ডব্লিউএইচও তাদের প্রতিবেদনে টিকার সংকটের বিষয়টিকে বিশেষভাবে সামনে এনেছে। সংস্থাটির মতে, ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার জাতীয় পর্যায়ের চরম ঘাটতিই আজকের এই পরিস্থিতির মূল কারণ। এক সময় বাংলাদেশে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা বর্তমানে আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে এসেছে। ২০২০ সালের পর থেকে কোনো জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি পালন না করাকেও এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এদিকে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিচ্ছে যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
