সাধারণ ব্যথানাশক হিসেবে পরিচিত চার হাজার বছরের পুরনো ওষুধ অ্যাসপিরিন এখন ক্যানসার প্রতিরোধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে, কেন এবং কীভাবে এই স্বল্পমূল্যের ওষুধটি নির্দিষ্ট কিছু টিউমার গঠন ও শরীরে ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
এই নতুন আবিষ্কারগুলো ইতিমধ্যে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতিতে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল জেনেটিক্সের অধ্যাপক জন বার্নের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্লিনিকাল ট্রায়াল এই ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী মোড় এনেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, লিন্ড সিনড্রোম নামক একটি বংশগত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য দৈনিক একটি নির্দিষ্ট মাত্রার অ্যাসপিরিন জীবন রক্ষাকারী হতে পারে। লিন্ড সিনড্রোম এমন একটি অবস্থা যা আক্রান্ত ব্যক্তির অন্ত্রের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। অধ্যাপক বার্নের ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী নিক জেমস নামের এক ব্যক্তি টানা ১০ বছর ধরে নিয়মিত অ্যাসপিরিন গ্রহণ করছেন এবং তিনি এখনো ক্যানসারমুক্ত রয়েছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা কমপক্ষে দুই বছর ধরে ৬০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন গ্রহণ করেছেন, তাদের অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। তবে সাম্প্রতিক ফলাফলগুলো আরও আশাব্যঞ্জক তথ্য দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, তুলনামূলক কম মাত্রা বা ৭৫ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিনও সমানভাবে কার্যকর হতে পারে। কম মাত্রার এই ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ উচ্চ মাত্রার অ্যাসপিরিন গ্রহণের ফলে অনেক সময় পাকস্থলীর আলসার বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
অ্যাসপিরিনের এই বিস্ময়কর গুণের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মেসোপটেমিয়ার ৪৪০০ বছরের পুরনো মাটির ট্যাবলেটেও উইলো গাছের ছাল থেকে তৈরি ওষুধের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা আধুনিক অ্যাসপিরিনের আদি রূপ।
১৮ শতকে এই উইলো ছালের জ্বর কমানোর ক্ষমতা আবিষ্কৃত হয় এবং ১৯ শতকের শেষে এটি বাজারে পরিচিতি পায়। ১৯৭২ সালে প্রথম ইঁদুরের ওপর গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, অ্যাসপিরিন ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া বা মেটাস্ট্যাসিস প্রতিরোধ করতে পারে।
২০১০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার রথওয়েল আরও বৃহৎ পরিসরে প্রমাণ করেন যে, এটি মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে কার্যকর।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আনা মার্টলিংয়ের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন গতির সঞ্চার করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, নির্দিষ্ট কিছু জেনেটিক মিউটেশন থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর নিয়মিত অ্যাসপিরিন গ্রহণ ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি অর্ধেকের বেশি কমিয়ে দেয়।
এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সুইডেনে অন্ত্রের ক্যানসার রোগীদের জন্য বিশেষ স্ক্রিনিং এবং নিয়মিত অ্যাসপিরিন দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও ইতিমধ্যে গাইডলাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে এনএইচএস পরামর্শ দিচ্ছে যে, লিন্ড সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ২০ বছর বয়স থেকেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অ্যাসপিরিন গ্রহণ শুরু করা উচিত।
তবে বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে নিয়মিত অ্যাসপিরিন গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। রক্ত পাতলা করার ক্ষমতা থাকায় এটি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা পাকস্থলীতে গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন অন্য ধরনের ক্যানসার যেমন স্তন বা প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে অ্যাসপিরিনের ভূমিকা নিয়ে কাজ করছেন, যার ফলাফল আগামী বছরের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
