বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই সংক্রামক ব্যাধির উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী একই সময়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৮৭ জন শিশু।
শনিবার বিকেলে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে হামের এই প্রকোপ শুরু হয় যা বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে আজ শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগে এক দিনেই পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় তিন শিশু এবং সিলেট বিভাগে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে শিশুদের মধ্যে হামের এই দ্রুত বিস্তার এবং মৃত্যুহার বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যারা টিকার আওতায় আসেনি তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি দেখা দিচ্ছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথিতে উঠে এসেছে। এই সময়ের মধ্যে সারা দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৬০৭ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৪ হাজার ৪৬০ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২০ হাজার ৪৭৫ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তবে আশার কথা হলো এই দীর্ঘ সময়ে ১৭ হাজার ৮১ জন শিশু চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। কিন্তু প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে ৪২ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২০৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ যা মূলত বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
যেসব এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটে বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে অনেক অভিভাবক সময়মতো শিশুদের টিকা না দেওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়ায় শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। যদি কোনো শিশুর শরীরে জ্বর ও লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয় তবে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ওষুধ ও ভ্যাকসিনের মজুদ রয়েছে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং সংক্রমিত শিশুকে আলাদা রাখার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং শিশুদের নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
