রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান অ্যালার্জি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমবর্ধমান অ্যালার্জি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার উপায়

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ অ্যালার্জিক রাইনাইটিস বা খড়জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূর্যের আলো আর ফুলের সমারোহ অনেকের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে এলেও অ্যালার্জি রোগীদের জন্য এটি দীর্ঘস্থায়ী হাঁচি, কাশি এবং চোখ দিয়ে জল পড়ার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পরাগরেণু যখন নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে তখন শরীরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয় যাকে আমরা সিজনাল অ্যালার্জি হিসেবে চিনি। অবাক করার মতো বিষয় হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অ্যালার্জির তীব্রতা এবং রোগীর সংখ্যা দুই-ই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যালার্জির চিকিৎসায় আমাদের সাধারণ প্রবণতা হলো দ্রুত কোনো অ্যান্টিহিস্টামিন পিল বা বড়ি সেবন করা। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী পিলের তুলনায় নাজাল কর্টিকোস্টেরয়েড বা অ্যান্টিহিস্টামিন স্প্রে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো ওরাল মেডিকেশন বা বড়ি প্রথমে পরিপাকতন্ত্রে যায় এবং সেখান থেকে রক্তে মিশে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। 

এর ফলে নাকে যেখানে ওষুধের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে খুব সামান্য অংশই পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে নাজাল স্প্রে সরাসরি আক্রান্ত টিস্যুতে কাজ করে এবং প্রদাহের পথগুলো বন্ধ করে দেয় যা হাঁচি বা নাক বন্ধ হওয়ার মতো উপসর্গ দ্রুত উপশম করতে সক্ষম।

গবেষণায় দেখা গেছে যারা দীর্ঘ সময় ধরে অ্যালার্জিতে ভুগছেন তাদের জন্য সম্মিলিত নাজাল স্প্রে অর্থাৎ যাতে কর্টিকোস্টেরয়েড এবং অ্যান্টিহিস্টামিন উভয়ই থাকে তা সবচেয়ে ভালো ফলাফল দেয়। 

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে সিজন শুরু হওয়ার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে চিকিৎসা শুরু করলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পরাগরেণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। এটি শুধুমাত্র উপসর্গ কমায় না বরং অ্যালার্জির আক্রমণকেও অনেকটা স্তিমিত করে দেয়। অ্যালার্জি বা খড়জ্বরকে অবহেলা করলে এটি দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস বা অ্যাজমার দিকে মোড় নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা।

দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ পরিবর্তন অ্যালার্জি রোগীদের কষ্ট অনেকটা লাঘব করতে পারে। পরাগরেণু বা পোলেন সাধারণত দিনের শুরুতে এবং শেষ বিকেলে বাতাসে বেশি থাকে তাই এই সময়ে ঘরের জানালা বন্ধ রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। বাড়ির বাইরে থেকে ফেরার পর দ্রুত জামাকাপড় পরিবর্তন করা এবং গোসল করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি কারণ কাপড়ে বা চুলে লেগে থাকা অদৃশ্য ধূলিকণা ঘরের ভেতর অ্যালার্জি ছড়িয়ে দিতে পারে। 

এছাড়া ঘরের ভেতরে হেপা ফিল্টার যুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করলে বাতাসের গুণমান উন্নত হয় এবং অ্যালার্জেন থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়।

চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রোদে বের হওয়ার সময় সানগ্লাস ব্যবহার করা একটি কার্যকর পদ্ধতি যা সরাসরি চোখের সংস্পর্শে পরাগরেণু আসতে বাধা দেয়। নাকের ভেতরে ভ্যাসলিন বা পেট্রোলিয়াম জেলির হালকা প্রলেপ দিলে তা ফিল্টার হিসেবে কাজ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যালার্জেনকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। 

এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অ্যালার্জির তীব্রতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তবে যদি ঘরোয়া উপায় বা সাধারণ স্প্রেতে কাজ না হয় তবে অবশ্যই একজন ইমিউনোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত কারণ আধুনিক ইমিউনোথেরাপি এখন অ্যালার্জির স্থায়ী সমাধানে অনেক বেশি সফল।

পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এখন অ্যালার্জির মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে যা আগে নির্দিষ্ট কয়েক সপ্তাহের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। শীতের শেষে বসন্তের আগমন বা শরতের শুরুতে বাতাসে যে পরিবর্তন আসে তা অনেকের শরীর গ্রহণ করতে পারে না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। 

তাই সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধের ব্যবহারই পারে এই ঋতুভিত্তিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে। চিকিৎসকদের মতে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অ্যালার্জি রোগীরাও সাধারণ মানুষের মতো প্রাণবন্ত জীবন উপভোগ করতে পারেন।

banner
Link copied!