বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ নারী এন্ডোমেট্রিওসিস নামক এক যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। এই রোগটি শনাক্ত করতে বর্তমানে গড়ে নয় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়, যা একজন নারীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি সাম্প্রতিক পাইলট স্টাডি বা প্রাথমিক গবেষণা নারীদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। গবেষকরা এমন একটি বিশেষ সিটি স্ক্যান প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন যা প্রচলিত পরীক্ষার তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে এবং অনেক আগে এই রোগটি শনাক্ত করতে সক্ষম।
এন্ডোমেট্রিওসিস এমন একটি অবস্থা যেখানে জরায়ুর আস্তরণের মতো কোষ শরীরের অন্য কোথাও, যেমন ডিম্বাশয় বা তলপেটে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এর ফলে ঋতুস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে অন্তত একজন এই সমস্যায় আক্রান্ত। বর্তমানে এই রোগটি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করার একমাত্র উপায় হলো ‘ল্যাপারোস্কোপি’ নামক একটি অস্ত্রোপচার, যেখানে ক্যামেরার মাধ্যমে পেটের ভেতরটি পরীক্ষা করা হয়। এই দীর্ঘসূত্রিতা ও অস্ত্রোপচারের ভয়ে অনেক নারী বছরের পর বছর সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন পদ্ধতিতে ‘স্পেক্ট-সিটি’ (SPECT-CT) স্ক্যানের সাথে ‘ম্যারাসিক্লাটাইড’ (Maraciclatide) নামক একটি বিশেষ মলিকুলার ট্রাসার বা রাসায়নিক নির্দেশক ইনজেকশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ট্রাসারটি শরীরের সেসব জায়গায় আটকে যায় যেখানে নতুন রক্তনালী তৈরি হচ্ছে, যা মূলত এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক বৃদ্ধির একটি প্রধান লক্ষণ। প্রচলিত আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই স্ক্যান অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ের বা সূক্ষ্ম এন্ডোমেট্রিওসিস ধরতে পারে না। কিন্তু এই নতুন প্রযুক্তিটি কোষের গঠনগত পরিবর্তনের পরিবর্তে সক্রিয় জৈবিক প্রক্রিয়াকে শনাক্ত করতে পারে।
গবেষণাটির নেতৃত্বদানকারী ডক্টর তাতিয়ানা গিবনস জানিয়েছেন যে, অনেক নারী তীব্র উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলেও স্ক্যান রিপোর্টে কিছুই ধরা পড়ে না বলে তাদের স্বাভাবিক বলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নতুন এই প্রযুক্তিটি সেই সব নারীদের জন্য একটি বড় সমাধান হতে পারে যাদের রোগটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ১৯ জন নারীর ওপর করা এই প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, ১৬ জনের ক্ষেত্রেই এটি সঠিকভাবে এন্ডোমেট্রিওসিসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি শনাক্ত করতে পেরেছে। পরবর্তীতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া ১৭টি কেসের মধ্যে ১৪টিই এই স্ক্যানে নির্ভুলভাবে ধরা পড়েছিল।
এই দীর্ঘ রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়ার শিকার ৩৩ বছর বয়সী গ্যাব্রিয়েলা পিয়ারসন তার যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে তাকে অসহ্য ঋতুস্রাব জনিত ব্যথায় ভুগতে হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ভুল চিকিৎসার পর ২৩ বছর বয়সে তিনি জানতে পারেন যে তার এন্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে। তিনি মনে করেন যে, যদি তার রোগটি আরও আগে ধরা পড়ত তবে তার শিক্ষা জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ত না। বর্তমানে তার অন্ত্র এবং মূত্রথলিতে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে যা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর লুসি হুইটেকার মনে করেন যে, এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তের জন্য এমন একটি অ-আক্রমণাত্মক বা নন-ইনভাসিভ পদ্ধতির খুব প্রয়োজন ছিল। যদিও এই পদ্ধতিতে রেডিয়েশন বা বিকিরণের একটি ঝুঁকি রয়েছে, যা বিবেচনা করা প্রয়োজন, তবে এটি অস্ত্রোপচারের ঝুঁকির তুলনায় অনেক কম হতে পারে। এই প্রযুক্তিটি কেবল রোগ নির্ণয় নয় বরং চিকিৎসার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকরা এখন আরও বড় পরিসরে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন যাতে এটি দ্রুত সাধারণ রোগীদের নাগালে পৌঁছাতে পারে।
