শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

হৃদস্পন্দনের ছন্দ কি আপনার মানসিক চাপের আয়না?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ১০:৩২ এএম

হৃদস্পন্দনের ছন্দ কি আপনার মানসিক চাপের আয়না?

লন্ডনের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী আর্তেম কিরিলভ দীর্ঘকাল ধরেই নিজের শরীরকে সাধ্যের বাইরে নিয়ে যেতে পছন্দ করতেন। স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে কর্মরত এই ব্যক্তি বিশ্বাস করতেন যে বিশ্রাম মানেই সময় নষ্ট। জিমে গিয়ে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত তিনি থামতেন না। কিরিলভ মনে করতেন, যত বেশি কঠোর পরিশ্রম করা হবে, ফলাফল তত ভালো আসবে। তবে তার এই ধারণা বদলে যায় যখন তিনি তার স্মার্টওয়াচে হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বা এইচআরভি ডেটা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেন। এখন তিনি শরীরকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার বদলে হৃদস্পন্দনের এই সংকেত বুঝে বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নেন।

সাধারণত আমরা হার্ট রেট বা প্রতি মিনিটে হৃদস্পন্দনের সংখ্যা সম্পর্কে সচেতন থাকি। কিন্তু হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বিষয়টি একটু ভিন্ন এবং জটিল। এটি মূলত দুটি হৃদস্পন্দনের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধানের সূক্ষ্ম পরিবর্তনকে বোঝায়। চিকিৎসকদের মতে, আমাদের হৃদপিণ্ড ঘড়ির কাটার মতো একেবারে নির্দিষ্ট তালের চেয়ে কিছুটা ছন্দহীন বা পরিবর্তনশীল থাকাই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো লক্ষণ। মাউন্ট সিনাই ফাস্টার হার্ট হসপিটালের পরিচালক ডক্টর দীপক ভাট জানান, সুস্থ হৃদপিণ্ডের স্পন্দনেও মিলি সেকেন্ডের ব্যবধানে তারতম্য থাকে। এই পরিবর্তনশীলতা যত বেশি হবে, শরীর তত বেশি খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম বলে ধরে নেওয়া হয়।

মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের দুটি প্রধান অবস্থা থাকে। একটি হলো যখন আমরা উত্তেজিত বা চাপে থাকি যাকে ফাইট অর ফ্লাইট বলা হয়। অন্যটি হলো যখন আমরা শান্ত থাকি বা বিশ্রাম নিই। হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি মূলত এই দুটি অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য কতটা কার্যকর তা প্রকাশ করে। যখন কোনো ব্যক্তি শারীরিক বা মানসিক চাপে থাকেন, তখন হৃদস্পন্দনের ব্যবধান কমে যায় এবং তাল অনেক বেশি স্থির হয়ে পড়ে। এর অর্থ হলো হৃদপিণ্ড তখন চাপের সাথে লড়াই করতে ব্যস্ত। বিপরীতভাবে, যখন শরীর শিথিল থাকে, তখন হৃদস্পন্দনের ব্যবধান বেড়ে যায় এবং এতে বৈচিত্র্য দেখা দেয় যা একটি ইতিবাচক সংকেত।

গবেষণায় দেখা গেছে যে হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটির কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ মান নেই। এটি বয়স, লিঙ্গ এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যেমন পঁচিশ বছর বয়সীদের জন্য গড় এইচআরভি মান ৭৮ মিলি সেকেন্ডের কাছাকাছি থাকে, যেখানে ৫৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি কমে ৪৪ মিলি সেকেন্ডে দাঁড়ায়। তবে স্মার্টওয়াচ বা ট্র্যাকার ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের নিজস্ব বেসলাইন বা নিয়মিত গড় মানের পরিবর্তন খেয়াল করা। যদি আপনার স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে এইচআরভি হঠাৎ কমে যায়, তবে বুঝতে হবে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে না অথবা আপনি অসুস্থ হতে চলেছেন।

বর্তমানে অ্যাথলেট বা খেলোয়াড়রা তাদের প্রশিক্ষণের তীব্রতা নির্ধারণে এই ডেটা ব্যবহার করছেন। যদি সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এইচআরভি কম দেখা যায়, তবে তারা সেদিন ভারী ব্যায়ামের বদলে হালকা হাঁটাচলা বা বিশ্রামকে বেছে নেন। এটি কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয় বরং মানসিক অবসাদ বা স্ট্রেস নির্ণয়েও সমানভাবে কার্যকর। অনেক সময় কাজের চাপে আমরা বুঝতে পারি না যে ভেতর থেকে আমরা কতটা বিপর্যস্ত। কিন্তু আমাদের হৃদস্পন্দনের এই সূক্ষ্ম ছন্দ শরীর ও মনের ক্লান্তি সবার আগে প্রকাশ করে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে এইচআরভি বাড়ানোর কিছু প্রাকৃতিক উপায়ও রয়েছে। এর মধ্যে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা ব্রেথওয়ার্ক অত্যন্ত কার্যকর। দিনে কয়েক মিনিট শান্ত হয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলে তা সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং হৃদস্পন্দনের ছন্দকে উন্নত করে। এছাড়াও নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক পুষ্টি এবং নিয়মিত শরীরচর্চা এই মান উন্নত করতে সাহায্য করে। তবে মনে রাখতে হবে যে স্মার্টওয়াচের ডেটা চিকিৎসকের বিকল্প নয়। যদি হৃদস্পন্দনে বড় কোনো পরিবর্তন বা অসুস্থতা বোধ হয়, তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কিরিলভ এখন তার নিজস্ব অ্যাপ তৈরি করেছেন যা হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটির মাধ্যমে মানসিক চাপ পরিমাপ করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করেন যে হার্ট রেট কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের জীবনের ছন্দের প্রতিফলন। আপনি যদি আপনার শরীরের ভাষা বুঝতে শিখেন, তবে অকাল বার্ধক্য বা হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি ট্র্যাকিং তাই আধুনিক লাইফস্টাইলে কেবল একটি ফ্যাশন নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

banner
Link copied!