হান্তাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা এক ব্যক্তি তার সেই ভয়াবহ দিনগুলোকে ‘পৃথিবীর বুকে নরক’ এবং ‘নির্যাতন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কানাডার বাসিন্দা লর্ন ওয়ারবার্টন তিন বছর আগে অর্থাৎ ২০২৩ সালের মার্চ মাসে এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি বিবিসি-কে জানান, শুরুতে তার শরীরে কোভিডের মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তিতে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই দ্রুত খারাপের দিকে যায় যে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং শরীর ঘামে ভিজে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে লাইফ সাপোর্ট মেশিনে নিতে হয়েছিল। হাসপাতালে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ লড়াই করার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। লর্ন মনে করেন, তার বাড়ির চিলেকোঠায় ইঁদুরের বিষ্ঠা জমে থাকা একটি কার্পেট ঝাড়ু দেওয়ার সময় তিনি সংক্রমিত হয়েছিলেন।
একই ধরনের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন জার্মানির ক্রিশ্চিয়ান এগে। ২০১৯ সালে হান্তাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি কিডনি অকেজো হওয়া এবং সেপসিসের মতো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। শুরুতে এটিকে সাধারণ ফ্লু মনে হলেও পরে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে এবং তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হতে হয়। লর্ন এবং ক্রিশ্চিয়ান দুজনেই এই ভাইরাসের নাম আগে কখনও শোনেননি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হান্তাভাইরাসের কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির সংক্রমণের ফলে মৃত্যুর হার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মূলত ইঁদুর বা বন্য ইঁদুরের শুকনো বিষ্ঠা ও প্রস্রাবের মাধ্যমে ঘটে। বাতাসের সংস্পর্শে আসা এই দূষিত কণা প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলেই সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী ডাচ ক্রুজ শিপ ‘এমভি হোন্ডিয়াস’-এ এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর হান্তাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই জাহাজটিতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিকও রয়েছেন বলে জানা গেছে। ৫৬ বছর বয়সী প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তা মার্টিন অ্যানস্টিসহ আরও তিনজনকে জরুরি চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্টিনের স্ত্রী নিকোলা জানিয়েছেন, তার স্বামীর অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল হলেও গত কয়েকদিন পরিস্থিতি অনেক ওঠানামা করেছে। জাহাজটি বর্তমানে আফ্রিকার উপকূল থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ) নিশ্চিত করেছে যে, সম্ভাব্য সংক্রমণের আশঙ্কায় দুইজন ব্রিটিশ নাগরিক বর্তমানে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর নামানুসারে এই ভাইরাসের নামকরণ করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে এর ২০টিরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। মূলত ইঁদুরের কামড় অথবা এদের মলমূত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া ধুলিকণা নিশ্বাসের সাথে গ্রহণে এই রোগ ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেপসিস বা কিডনি বিকল হওয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে চিকিৎসকরা এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এবং জাহাজটির যাত্রীদের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
