নারীদের ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড শুরুর আগের দিনগুলো অনেকের জন্যই সাধারণ শারীরিক অস্বস্তির কারণ হয়। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই সময়টি চরম মানসিক বিপর্যয় ও আত্মহননের চিন্তার মতো ভয়াবহ রূপ নেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হরমোনের এই মারাত্মক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বা পিএমডিডি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ৪২ বছর বয়সী অ্যানিকা ওয়াহিদ এবং ২১ বছর বয়সী কেটি কুকের মতো ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এই সংকটের গভীরতা সামনে এনেছে।
অ্যানিকা দীর্ঘ আট বছর ধরে এই যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করছেন।
তিনি জানান, প্রতি মাসের প্রায় দুটি সপ্তাহ তাঁকে তীব্র আত্মহত্যার চিন্তা তাড়া করে বেড়ায়। অথচ পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকারের মেঘ কেটে যায় এবং তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের স্বাভাবিক ওঠানামার প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার কারণে এই তীব্র মানসিক অবক্ষয় ঘটে। সাধারণ প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিন্ড্রোম বা পিএমএস-এ ক্লান্তি বা মেজাজ খিটখিটে হলেও পিএমডিডি আক্রান্তদের ক্ষেত্রে তীব্র বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক যন্ত্রণা দেখা দেয়।
গ্লোবাল রিসার্চ চ্যারিটি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসঅর্ডারস (আইএপিএমডি) ধারণা করছে, যুক্তরাজ্যেই প্রায় ১০ লাখের বেশি নারী পিএমডিডিতে ভুগছেন। তবে তাদের মধ্যে খুব সামান্য অংশই সঠিক রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসের আওতায় এসেছেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের গবেষক ড. লিনসে ম্যাথিউস একটি নতুন সুইসাইড প্রিভেনশন টুল বা আত্মহত্যা প্রতিরোধ নির্দেশিকা তৈরি করেছেন। এটি চিকিৎসকদের দ্রুত পিএমডিডির লক্ষণ চেনার পাশাপাশি রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে তাদের মাসিক চক্রের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করবে।
অনেক নারীই চিকিৎসকদের অবহেলা বা সঠিক সময়ের অভাবে এই রোগটি চিহ্নিত করতে পারেন না। নারীদের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. হেলেন ওয়াল জানান, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় একজন রোগীর জন্য মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় পাওয়া যায়। এই স্বল্প সময়ে কোনো নারীর হরমোনজনিত জটিলতার সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা এবং তার মানসিক সংকটের গভীরতা বোঝা চিকিৎসকদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে রোগীরা প্রায়ই ভুল চিকিৎসার শিকার হন অথবা সঠিক পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম সংকটের দিকে ধাবিত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন এই রোগটি নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে, যেখানে টিকটকে পিএমডিডি হ্যাশট্যাগযুক্ত পোস্টগুলো ২৩ কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে। ২১ বছর বয়সী কেটি কুক তেমনই একজন, যিনি প্রায় এক দশক ধরে লড়াই করার পর ২০১৫ সালে নিজের রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হন। কেটি তাঁর এই অবস্থাকে বিখ্যাত চরিত্র `জেকিল অ্যান্ড হাইড`-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে পিরিয়ডের আগের সময়টাতে তাঁর পুরো ব্যক্তিত্ব ও চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা প্রথমে তাঁর এই মেজাজের পরিবর্তনকে বয়সের সাধারণ পরিবর্তন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
পিএমডিডির চিকিৎসার জন্য বর্তমানে অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গর্ভনিরোধক পিল এবং কিছু ক্ষেত্রে কৃত্রিম মেনোপজ তৈরির মতো ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়। অ্যানিকা বর্তমানে হরমোন ব্লক করার ইনজেকশন নিচ্ছেন, তবে এই ওষুধের কার্যকারিতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ভেতরে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা জেগে ওঠে। এই রোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে তিনি কখনো মা হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারেননি। চিকিৎসা ব্যবস্থার সঠিক সম্প্রসারণই কেবল লাখো নারীকে এই মাসিক অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
