যুক্তরাজ্যের বিতর্কিত সরাসরি অ্যাকশন গ্রুপ ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবৈধ বলে হাইকোর্ট যে যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আপিল করতে যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার। মঙ্গলবার লন্ডনের আপিল আদালতে এই মামলার দুই দিনের শুনানি শুরু হয়েছে।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্টের শীর্ষ বিচারকরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বেআইনি বলে বর্ণনা করেছিলেন। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিস এখন সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করছে। এই আইনি লড়াইটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন গাজা সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে প্রতিবাদ এবং নাগরিক অবাধ্যতার মাত্রা তীব্রতর হয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন মূলত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। গত গ্রীষ্মে ব্রিটিশ সরকার যখন এই গোষ্ঠীটিকে নিষিদ্ধ করে, তখন থেকেই এর পক্ষে এবং বিপক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞার পর হাজার হাজার ব্রিটিশ নাগরিক একটি সমন্বিত নাগরিক অবাধ্যতা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ আইনের আওতায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অপরাধ ছিল কেবল ‘আমি জেনোসাইড বা গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি’ লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা। হাইকোর্টের রায়ে সরকারের অবস্থান ধাক্কা খেলেও আপিল প্রক্রিয়া চলাকালীন এই নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে এই গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা যুক্তরাজ্যে আইনত দণ্ডনীয়।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ হাইকোর্টের রায়ের পর শুরুতে সমর্থকদের গ্রেপ্তার না করার ইঙ্গিত দিলেও কয়েক সপ্তাহ পরেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। চলতি মাসের শুরুর দিকেই লন্ডনের কেন্দ্রস্থল থেকে অন্তত ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সপ্তাহে স্যালি রুনি, গ্রেটা থুনবার্গ এবং ইসরায়েলি ঐতিহাসিক ইলান প্যাপের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
এই চিঠিতে তারা সরাসরি গোষ্ঠীটির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন, যা তাদেরও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে ফেলেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ব্রিটিশ সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে নজিরবিহীন বাড়াবাড়ি হিসেবে নিন্দা করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, যুক্তরাজ্য গাজায় চলমান পরিস্থিতির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন ব্যবহার করছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশন ২০২০ সালে হুদা আম্মোরি এবং রিচার্ড বার্নার্ডের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়। গোষ্ঠীটির মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্যের মাটিতে ইসরায়েলি অস্ত্র কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করা। বর্তমানে অনেক অ্যাক্টিভিস্ট কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং কেউ কেউ এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আমরণ অনশন পালন করেছেন।
বন্দিদের অভিযোগ, তাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। যদিও বিচার মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত মাসে এক বিবৃতিতে বলেছে যে, যখন রাষ্ট্র প্রতিবাদী কর্মকাণ্ড এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেটি কেবল নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে না বরং নাগরিক স্বাধীনতাকেও ধূলিসাৎ করে দেয়।
আপিল আদালতের রায় কবে নাগাদ আসবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এই মামলাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তবে তিনি এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি।
