রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

লেবাননের ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’: বেসামরিক হত্যা না হিজবুল্লাহ দমন?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম

লেবাননের ‘ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে’: বেসামরিক হত্যা না হিজবুল্লাহ দমন?

২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল দিনটি লেবাননের ইতিহাসে ‍‍`ব্ল্যাক ওয়েডনেসডে‍‍` বা কালো বুধবার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ওই দিন মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে সারা দেশে ১০০টিরও বেশি হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। এই নজিরবিহীন হামলায় অন্তত ৩৫৭ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও উদ্ধারকারী সংস্থা। 

ইসরায়েল দাবি করেছে যে তারা হিজবুল্লাহর ২৫০ জন সদস্যকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালিয়েছে তবে মাঠ পর্যায়ের তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তদন্ত এই দাবির সত্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষকরা এই হামলাকে নির্বিচার এবং সরাসরি বেসামরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার শামিল বলে বর্ণনা করেছেন।

বৈরুতের তাল্লেত এল খায়াত এলাকার বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী আহমদ হামদির অভিজ্ঞতা সেই দিনের ভয়াবহতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। তার নিজের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের ভবনটি চোখের পলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখেছেন তিনি। আহমদ জানান যে আবাসিক এলাকায় বসে থাকার সময় তিনি এমন এক শব্দ শোনেন যা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। ভাগ্যক্রমে তার জীবন বাঁচলেও তার চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। 

স্থানীয়দের মতে তাল্লেত এল খায়াতের মতো আবাসিক এলাকাগুলো সাধারণত নিরাপদ মনে করা হয় কিন্তু ইসরায়েলের এই আক্রমণ প্রমাণ করেছে যে লেবাননের কোনো অংশই এখন আর হামলার বাইরে নেই।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের লেবানন গবেষক রামজি কাইস আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে দিনের মাঝখানে কোনো প্রকার সতর্কতা ছাড়াই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একযোগে কয়েক ডজন হামলা চালানোর পদ্ধতিটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চরম বেপরোয়া আচরণের প্রমাণ। তিনি জানান যে যখন বেসামরিক নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন ঠিক তখনই এই হামলাগুলো করা হয়েছে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য স্বাধীন সংস্থার মতে এই ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং সরাসরি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।

ইসরায়েল দীর্ঘ সময় ধরে দাবি করে আসছে যে তাদের প্রতিটি হামলা সুনির্দিষ্টভাবে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার বা অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে চালানো হয়। ৮ এপ্রিলের হামলার পর তারা হিজবুল্লাহর সদর দপ্তর এবং রাদওয়ান ফোর্সের সম্পদ ধ্বংসের দাবি তুলেছিল। কিন্তু লেবাননের আইনি সংস্থা ‘লিগ্যাল এজেন্ডা’-র গবেষক ঘিদা ফ্রাঞ্জিয়েহ জানান যে ওই দিন নিহতদের মধ্যে ১০১ জন ছিলেন নারী ও শিশু। 

তিনি বলেন যে ইসরায়েলের ২৫০ জন যোদ্ধা হত্যার দাবি যদি সত্য হতে হয় তবে নিহত প্রতিটি পুরুষকেই হিজবুল্লাহর সদস্য হতে হবে যা আদতে সত্য নয়। তারা মাঠ পর্যায়ে অনেক বেসামরিক পুরুষ নিহতের প্রমাণ পেয়েছেন যাদের সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

এই যুদ্ধের একটি বড় কৌশলগত দিক হলো দক্ষিণ লেবাননে একটি বাফার জোন বা জনশূন্য অঞ্চল তৈরি করা। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা বা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলো ধ্বংস করছে যাতে সেখানে মানুষের বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে হিজবুল্লাহ দমনের নামে ইসরায়েল আসলে লেবাননের একটি বিশাল অঞ্চলকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলার নীতি গ্রহণ করেছে। 

জাতিসংঘের তথ্যমতে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরায়েল এ পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি বার লঙ্ঘন করেছে যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই কালো বুধবারের হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে দক্ষিণ লেবানন এবং বেকা উপত্যকায় মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করেছে।

banner
Link copied!