রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপের গাজায় বাড়ছে ইঁদুর ও বেজির আতঙ্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২, ২০২৬, ০২:৫২ পিএম

ধ্বংসস্তূপের গাজায় বাড়ছে ইঁদুর ও বেজির আতঙ্ক

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য এখন নতুন এক বিভীষিকার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইঁদুর এবং বেজি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ আর ধ্বংসলীলার পর এখন অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে ইঁদুর ও বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ঘুমের ঘোরে ছোট শিশু, অসুস্থ এবং বয়স্করা এসব প্রাণীর আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গাজার তাঁবুগুলোতে বসবাসকারী মানুষের এই মানবেতর পরিস্থিতির করুণ চিত্র।

গাজা সিটির বাসিন্দা সামাহ আল-দাবলা জানান, রাত ২টার দিকে তার চার বছর বয়সী মেয়ে মায়াসিনের আর্তচিৎকারে তাদের ঘুম ভাঙে। টর্চ জ্বালিয়ে তারা দেখেন একটি বেজি পালিয়ে যাচ্ছে এবং মায়াসিনের হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে। শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে টিটেনাস ইনজেকশন দেওয়া হলেও বেশ কয়েক দিন ধরে সে জ্বর ও বমির সমস্যায় ভুগেছে। বর্তমানে সে তাদের অস্থায়ী তাঁবুতে সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই চালাচ্ছে। কেবল মায়াসিন নয়, গাজার অনেক শিশুকেই এখন ইঁদুর ও বেজির কামড়ে রক্তাক্ত হতে হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফুটেজে দেখা গেছে, বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্পগুলোতে দলবেঁধে ইঁদুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এক বৃদ্ধার পায়ের আঙুলের অংশ ইঁদুর কামড়ে খেয়ে ফেলার মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটেছে। জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ বাস্তুচ্যুত শিবিরে এখন ইঁদুর ও পোকামাকড়ের উপদ্রব স্পষ্ট। এর ফলে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ইঁদুরের কামড়, আঁচড় কিংবা তাদের মলমূত্র থেকে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, রক্তে সংক্রমণ এবং ফুড পয়জনিংয়ের মতো জটিল রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি ডক্টর রেইনহিল্ড ভ্যান ডি উইর্ট বলেন, "বাসস্থানের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় এই উপদ্রব মূলত একটি অনিবার্য পরিণতি।" গাজায় বর্তমানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। খোলা জায়গায় জমে থাকা বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশন নালাগুলো এখন ইঁদুর ও বেজির প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও গাজার মানবিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও এখনো সেখানে নিয়মিত বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, অস্থায়ী আবাসনের জন্য গাজাবাসীর প্রায় ২ লাখ ক্যারাভান প্রয়োজন, কিন্তু এর কিছুই এখন পর্যন্ত পৌঁছায়নি। ময়লার স্তূপের পাশে বসবাস করা রিজক আবু লায়লা আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। ঘুমালেই ইঁদুর আর বেজি শিশুদের কামড় দেয়। ওরা আমাদের জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলছে এবং খাবারের ময়দা খেয়ে নিচ্ছে।"

ইউনিসেফ এবং অন্যান্য ত্রাণ সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, গাজা জুড়ে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ এবং আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য একটি বিশাল পরিসরের অভিযান প্রয়োজন। তবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সংস্থা ‍‍`কোগাট‍‍` (Cogat) জানিয়েছে, তারা স্যানিটেশন চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। তবে মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির উন্নতি অত্যন্ত ধীর। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মৃতদেহ এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এই স্বাস্থ্য সংকট অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!