লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন দফার বিমান হামলায় গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত দুই সপ্তাহ আগে একটি তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে এই প্রাণহানির ফলে গত ২ মার্চ থেকে লেবাননের ওপর ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৬৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত অন্তত ৮ হাজার ১৮৩ জন আহত হয়েছেন বলে সরকারি পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, নাবাতিয়ে জেলার শুকিন শহরে ইসরায়েলি হামলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে কফর দাজ্জাল গ্রামে একটি চলন্ত গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে আরও দুজন নিহত হন। এছাড়া লোয়াইজেহ গ্রামে একটি বসতবাড়িতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে তিনজন এবং শুকিন গ্রামে পৃথক আরেকটি হামলায় আরও দুজন প্রাণ হারান। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো নাবাতিয়ে শহরের আল-কুদস চত্বরের কাছে একটি বেকারি এবং টায়ার জেলার সিদ্দিকিন শহরেও ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে।
কূটনৈতিক পরিভাষায় গত ১৭ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যা পরবর্তীতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তে এই চুক্তির কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা কেবল ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, তবে লেবানন সরকারের তথ্য অনুযায়ী নিহতদের একটি বড় অংশই সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ইতিমধ্যে লেবাননের প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা লেবাননের অভ্যন্তরে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রাখবে। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে যে তারা বিন জিবাইল এবং হুলা গ্রামের কাছে ইসরায়েলি সেনা ও সামরিক যানের ওপর কামানের গোলা এবং আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হিজবুল্লাহ ফাইবার-অপটিক ড্রোনের মাধ্যমে ইসরায়েলি মেরকাভা ট্যাঙ্ক এবং সামরিক যানবাহনে আঘাত হানার নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এই সংঘর্ষে অন্তত তিনজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক মহলে এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের দূত ফু চং নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের বলেছেন যে বর্তমানে লেবাননে কোনো প্রকৃত যুদ্ধবিরতি নেই, বরং এটি একটি ‘সামান্য কম বিধ্বংসী যুদ্ধ’ মাত্র। মে মাসের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে চীন স্পষ্ট জানিয়েছে যে ইসরায়েলের উচিত অবিলম্বে এই বোমাবর্ষণ বন্ধ করা। তবে ইসরায়েলের ভেতরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর জনমতের চাপ বাড়ছে যুদ্ধবিরতি বাতিল করে হামলা আরও জোরদার করার জন্য। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, লেবানন সীমান্ত নিয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা আরও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
