ইসলামের ইতিহাসে যে কয়জন ব্যক্তিত্বের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) অন্যতম। ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি এবং অর্ধ-জাহান শাসনে তার ভূমিকা ছিল অনবদ্য। তবে এই মহান বীরের জন্ম ও প্রাথমিক জীবন ছিল আরবের আর দশটি সাধারণ শিশুর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন এবং আভিজাত্যপূর্ণ। তার জন্ম হয়েছিল কুরাইশ বংশের এক অত্যন্ত মর্যাদাবান ও সাহসী পরিবারে, যা তাকে পরবর্তী জীবনে এক আপসহীন নেতায় পরিণত করেছিল।
হযরত ওমর (রা:) হস্তী হস্তী যুদ্ধের ১৩ বছর পর অর্থাৎ আনুমানিক ৫৮৩-৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম খাত্তাব ইবনে নুফায়ল এবং মাতার নাম হানতামা বিনতে হাশিম। তিনি কুরাইশ বংশের `বনূ আদি` গোত্রের সন্তান ছিলেন। সে যুগে মক্কার কুরাইশদের মধ্যে বনূ আদি গোত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এই গোত্রের লোকেরা বংশ পরম্পরায় কুরাইশদের মধ্যে রাষ্ট্রদূত বা বিবাদ মীমাংসাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ওমরের (রা:) পূর্বপুরুষরা তাদের মেধা ও বাগ্মিতার জন্য গোটা আরবে সমাদৃত ছিলেন।
শৈশব থেকেই ওমর (রা:) অত্যন্ত মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। তৎকালীন আরবে যেখানে লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা, সেখানে ওমর (রা:) ছোটবেলাতেই লিখতে ও পড়তে শেখেন। তার পিতা খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত কড়া মেজাজের মানুষ। তিনি ওমরকে (রা:) দিয়ে মরুভূমিতে উট চরানোর কাজ করাতেন। এই কঠোর পরিশ্রম ও তপ্ত মরুভূমির জীবন ওমরের (রা:) শরীর ও মনকে ইস্পাতের মতো শক্ত করে গড়ে তুলেছিল। তিনি কুস্তি, ঘোড়দৌড় এবং তলোয়ার চালনায় আরবের অন্যতম সেরা যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আরবের বিখ্যাত `উকাজ` মেলায় তার কুস্তি দেখার জন্য মানুষ ভিড় জমাত।
ওমরের (রা:) আভিজাত্য ও পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে মক্কার অভিজাত সমাজে এক বিশেষ স্থান দিয়েছিল। যৌবনে তিনি যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে পদার্পণ করেন, তখন তার বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায়পরায়ণতা সবার নজর কাড়ে। তার বংশীয় ঐতিহ্যের কারণেই তাকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়া হতো। কোনো গোত্রের সাথে সন্ধি বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে হলে ওমরের (রা:) বিকল্প তখন মক্কায় কেউ ছিল না। তার এই বাগ্মিতা ও সাহসিকতাই পরবর্তীকালে ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্পদে পরিণত হয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা.) ওমরের (রা:) তেজস্বিতা ও ব্যক্তিত্ব দেখে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, "হে আল্লাহ! ওমর ইবনুল খাত্তাব অথবা আবু জাহেলের মধ্যে যে আপনার প্রিয়, তাকে দিয়ে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।" আল্লাহ তায়ালা রাসূলের (সা.) সেই দোয়া ওমরের (রা:) পক্ষে কবুল করেন। ওমরের (রা:) জন্মের সেই দিনটি এবং তার বংশীয় মর্যাদা মূলত ইসলামি খেলাফতের এক বিশাল স্তম্ভ তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তার জন্ম ও শৈশব থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা ও বীরত্বই তাকে `আল-ফারুক` বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
