রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

হযরত ওমর (রা:)-এর ন্যায়বিচারের স্বর্ণযুগ: কেমন ছিল তার শাসন ব্যবস্থা?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ১২:০৩ এএম

হযরত ওমর (রা:)-এর ন্যায়বিচারের স্বর্ণযুগ: কেমন ছিল তার শাসন ব্যবস্থা?

ইসলামের ইতিহাসে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:)-এর শাসনামলকে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্ধ-জাহান শাসন করেও তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ওমরের (রা:) শাসনের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা এবং জনগণের প্রতি গভীর মমতা। তার শাসন ব্যবস্থা শুধুমাত্র তলোয়ারের শক্তিতে নয় বরং ইনসাফ ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তিনি মনে করতেন, ক্ষমতার সিংহাসন বিলাসিতার জন্য নয় বরং এটি একটি আমানত, যার প্রতিটি কণার হিসাব তাকে কিয়ামতের দিন দিতে হবে।

ওমরের (রা:) শাসনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তার ব্যক্তিগত তদারকি বা ‘নাইট প্যাট্রল’। অধিকাংশ শাসক যখন রাতে প্রাসাদের নিরাপত্তায় ঘুমিয়ে থাকতেন, তখন ওমর (রা:) মদিনার অলিতে-গলিতে সাধারণ মানুষের বেশে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি দেখতে চাইতেন তার প্রজারা শান্তিতে আছে কি না। এমনই এক রাতে তিনি লক্ষ্য করলেন একটি ঘরের ভেতর চুলায় হাড়ি চড়ানো এবং কয়েক শিশু কান্নাকাটি করছে। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে তিনি দেখলেন এক বৃদ্ধা মা পাথরের টুকরো সেদ্ধ করছেন যাতে শিশুরা মনে করে খাবার রান্না হচ্ছে এবং তারা অপেক্ষায় থেকে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। এই দৃশ্য দেখে ওমর (রা:) বিচলিত হয়ে পড়েন এবং তৎক্ষণাৎ বাইতুল মাল থেকে আটা ও চর্বির বস্তা নিজের পিঠে বহন করে সেই ঘরে নিয়ে যান। যখন তার ভৃত্য বস্তাটি বহন করতে চাইল, তখন ওমর (রা:) বলেছিলেন যে, কিয়ামতের দিন কি তুমি আমার গুনাহের বোঝা বহন করবে? এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে প্রজাদের ক্ষুধার জন্য তিনি নিজেকে কতটা দায়ী মনে করতেন।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। ওমরের (রা:) কাছে আমির ও ফকিরে কোনো পার্থক্য ছিল না। এমনকি অপরাধ করলে নিজ সন্তানকেও তিনি শাস্তি দিতে দ্বিধা করেননি। তিনি প্রাদেশিক গভর্নরদের নিয়োগ দেওয়ার সময় তাদের সম্পদের হিসাব নিতেন এবং নির্দেশ দিতেন যেন তারা দামী পোশাক না পরেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় তাদের দরজা খোলা রাখেন। একবার মিশরের গভর্নরের ছেলের বিরুদ্ধে এক সাধারণ কিবতি নাগরিকের অভিযোগ শুনে তিনি গভর্নর ও তার ছেলেকে মদিনায় তলব করেন এবং সেই সাধারণ নাগরিকের হাত দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো গভর্নর পুত্রকে প্রহার করান। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, মানুষ যখন স্বাধীন হয়ে জন্ম নিয়েছে, তখন তোমরা তাদের গোলাম বানিয়ে রাখার সাহস কোথায় পেলে?

ওমরের (রা:) প্রশাসনিক সংস্কার ছিল যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনিই প্রথম বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। জনগণের জন্য পেনশন ব্যবস্থা, বিধবা ও এতিমদের জন্য বিশেষ ভাতা এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার প্রথা তিনি চালু করেছিলেন। তবে তার এই জনকল্যাণমূলক কাজগুলো শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। একবার এক বৃদ্ধ ইহুদিকে ভিক্ষা করতে দেখে তিনি ব্যথিত হন এবং তার জিজিয়া কর মওকুফ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আজীবন ভাতা প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি বলেছিলেন যে, যৌবনে আমরা তার কাছ থেকে কর নেব আর বার্ধক্যে তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেব, তা হতে পারে না।

বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও ওমরের (রা:) ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। তার পোশাকে অনেক সময় তালি লাগানো থাকত এবং তিনি মাটিতে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন। জেরুজালেম বিজয়ের পর যখন তিনি সেখানে যাচ্ছিলেন, তখন তার উটে চড়ার পালা ছিল ভৃত্যের সাথে ভাগ করা। যখন তিনি জেরুজালেমে পৌঁছালেন, তখন নিয়ম অনুযায়ী ভৃত্য ছিল উটের পিঠে আর খলিফা নিজে উটের লাগাম ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সিরিয়ার খ্রিস্টানরা এই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, একজন বিশ্বজয়ী শাসক কতটা বিনয়ী হতে পারেন। ওমরের (রা:) একটি বিখ্যাত উক্তি আজও শাসকের জন্য আদর্শ হয়ে আছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে, সুদূর ফোরাত নদীর তীরেও যদি একটি কুকুর না খেয়ে মারা যায়, তবে তার জন্যও ওমরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এই গভীর দায়িত্ববোধই তাকে ইতিহাসে ‘আল-ফারুক’ বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে অমর করে রেখেছে।

banner
Link copied!