ইসলামের ইতিহাসে হযরত আলী (রা:) এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্পর্ক ছিল এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। শুধুমাত্র পারিবারিক সূত্রে নয়, বরং আদর্শিক ও আত্মিক দিক থেকেও তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। আলী (রা:) নবীজীর জীবনে মূলত তিনটি প্রধান পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন—তিনি ছিলেন নবীজীর আপন চাচাতো ভাই, প্রিয় জামাতা এবং ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত বিশ্বস্ত এক সেনানী। তাদের এই সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মক্কার সেই সময়ে, যখন ইসলামের দাওয়াত সবেমাত্র শুরু হয়েছিল।
পারিবারিক সূত্রে হযরত আলী (রা:) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর আপন চাচা আবু তালিবের পুত্র। অর্থাৎ তারা দুজন ছিলেন আপন চাচাতো ভাই। কিন্তু এই সম্পর্কটি শুধুমাত্র রক্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। নবীজী যখন ছোটবেলায় এতিম হন, তখন চাচা আবু তালিব তাকে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা সংকটাপন্ন হয়, তখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুহাম্মদ (সা.) ছোট আলীকে নিজ ঘরে নিয়ে আসেন। শৈশব থেকেই আলী (রা:) নবীজীর আদর্শে ও তাঁর নিবিড় তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন। এ কারণেই শিশুদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করার গৌরব অর্জন করেন।
নবীজীর সাথে আলী (রা:)-এর দ্বিতীয় প্রধান সম্পর্কটি হলো বৈবাহিক। মদিনায় হিজরত করার পর মহানবী (সা.) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা (রা:)-কে আলীর সাথে বিয়ে দেন। এর ফলে আলী (রা:) নবীজীর পরম প্রিয় জামাতা হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন। এই বিয়ের মাধ্যমে নবীজীর বংশধারা আলী ও ফাতেমার সন্তানদের মাধ্যমেই পৃথিবীতে টিকে থাকে। ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের মতো প্রিয় দৌহিত্রদের পিতা হিসেবে আলী (রা:) নবীজীর পরিবারের অর্থাৎ ‘আহলে বাইত’-এর এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন।
এছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) আলীকে তাঁর আধ্যাত্মিক ভাই হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। হিজরতের পর যখন নবীজী মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে দিচ্ছিলেন, তখন তিনি আলীর হাত ধরে বলেছিলেন, "দুনিয়া ও আখেরাতে তুমি আমার ভাই।" এই ঘোষণাটি আলীর প্রতি নবীজীর গভীর আস্থা ও ভালোবাসার পরিচয় দেয়। হিজরতের রাতে নিজের জীবন বাজি রেখে নবীজীর বিছানায় শুয়ে থাকা কিংবা খন্দক ও খায়বারের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলী (রা:) প্রমাণ করেছেন তিনি ছিলেন নবীজীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঢাল।
নবীজী এবং আলীর এই বহুমুখী সম্পর্ক শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কোনো আবেগ ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের দাওয়াত প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। নবীজী আলীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে বলেছিলেন, "আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা।" এই উক্তিটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, আলী (রা:) নবীজীর কতটা নিকটতম এবং প্রিয় ছিলেন। তাদের এই রক্ত ও আদর্শের বন্ধন কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
