ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসের অন্যতম স্তম্ভ হলো আখেরাত বা পরকালের ওপর বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কেয়ামত বা শেষ বিচারের দিন। ইসলামি দর্শন অনুযায়ী এই পৃথিবী হলো মানুষের জন্য একটি পরীক্ষাগার আর জান্নাত থেকে মানুষের আগমনের শুরু।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কেয়ামতের অনিবার্যতা সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল মোমেনের ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে কেয়ামত অবশ্যই আসবে এবং এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে মানবজাতির এক বড় অংশ এই অমোঘ সত্যকে বিশ্বাস করে না। যখন এই মহাপ্রলয় সংঘটিত হবে তখন আর কারো পক্ষেই তা অস্বীকার করার পথ থাকবে না বলে সূরা আল ওয়াকিয়ায় সতর্ক করা হয়েছে।
কেয়ামত বা মহাপ্রলয় হঠাৎ করে সংঘটিত হবে না বরং তার আগে অনেকগুলো পূর্বলক্ষণ বা আলামত প্রকাশ পাবে। বর্তমান সময়ে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র আমরা দেখি তার অনেক কিছুই কেয়ামতের ক্ষুদ্র নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের মধ্যে ইমান নষ্ট হওয়া, মায়ামমতা ও দয়া লোপ পাওয়া এবং অহেতুক রক্তপাত ও হানাহানি বৃদ্ধি পাওয়া কেয়ামতেরই ইঙ্গিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস অনুযায়ী শেষ জামানায় মিথ্যার প্রসার ঘটবে এবং দ্বীনি জ্ঞান বা ইলম উঠে যাবে।
এমনকি মানুষের মধ্যে আমানতদারি রক্ষা করার প্রবণতা কমে যাবে এবং সমাজ সুদ ও ঘুষের অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। সেই কঠিন সময়ে নিজের ইমান ধরে রাখা আগুনের জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখার মতো কঠিন হবে বলে মহানবী (সা.) সতর্ক করেছেন। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় ফোরাত নদী থেকে সোনার পাহাড় উন্মোচনের কথাও বলা হয়েছে যা নিয়ে মানুষ মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হবে।
কেয়ামতের ভয়াবহতা সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনা অত্যন্ত হৃদকম্পনকারী। সূরা ওয়াকিয়ায় বলা হয়েছে যে পৃথিবী যখন প্রবল কম্পনে কম্পিত হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধূলিকণায় পরিণত হবে তখনই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
সেই মহাপ্রলয়ের আগে অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং ঘন ঘন ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেবে। মানুষের হাতে সম্পদের প্রাচুর্য এত বাড়বে যে জাকাত নেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর চারদিক থেকে হামলার প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
এই অবস্থাগুলো মুমিনদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে যাতে তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসে। সূরা আশ শুরার ৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন সেই দিনটি আসার আগেই যেন মানুষ তার রবের ডাকে সাড়া দেয় কারণ সেদিন আল্লাহর হাত থেকে বাঁচানোর মতো কোনো আশ্রয়স্থল থাকবে না।
ইসলামি বিশেষজ্ঞরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে কেয়ামতের ১০টি বড় নিদর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল ধোঁয়ায় আকাশ আচ্ছন্ন হওয়া, দজ্জালের আবির্ভাব, অদ্ভুত এক প্রাণীর বা দাব্বাতুল আরদ্বের আত্মপ্রকাশ এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়।
এছাড়া ঈসা (আ.)-এর আগমন, ইয়াজুজ-মাজুজের আক্রমণ এবং বিশ্বের তিন প্রান্ত বিশেষ করে পূর্ব, পশ্চিম ও আরব ভূখণ্ডে ভূমিধসের মতো ঘটনা ঘটবে। কাফেররা কেয়ামতকে অস্বীকার করলেও সূরা সাবায় আল্লাহ শপথ করে বলেছেন যে কেয়ামত অবশ্যই আসবে।
এটি অতর্কিতভাবে তাদের ওপর আপতিত হবে এবং তাদের হতভম্ব করে দেবে। সেদিন কারো পালানোর বা তা প্রতিহত করার ক্ষমতা থাকবে না।
পরিশেষে মুমিন বান্দার জন্য করণীয় হলো প্রতিটি মুহূর্তকে জীবনের শেষ মুহূর্ত বিবেচনা করে নেক আমলে মশগুল থাকা। কেয়ামতের মাঠে মানুষের দুনিয়াবি পরিচয় বা সম্পদের কোনো মূল্য থাকবে না। সেদিন একজন মানুষ অন্য মানুষের কোনো উপকারে আসবে না এবং কোনো বিনিময় বা মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না।
সূরা বাকারার ১২৩ নম্বর আয়াতে সেই কঠিন দিনকে ভয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জান্নাত এবং জাহান্নামের ফয়সালা হবে মানুষের আমলনামার ওপর ভিত্তি করে। যারা দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাদের জন্য থাকবে চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত আর যারা ব্যর্থ হবে তাদের ঠিকানা হবে ভয়াবহ জাহান্নাম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন।
