ইসলামি বর্ষপঞ্জির অন্যতম মহিমান্বিত ইবাদত ঈদুল আজহা সন্নিকটে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পশু কুরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কুরবানি কেবল একটি পশু জবেহ করার নাম নয়, বরং এটি হলো বান্দার পক্ষ থেকে মহান রবের দরবারে তাকওয়া ও আনুগত্যের এক মহান পরীক্ষা। কুরআনের ভাষায়, আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় কেবল অন্তরের তাকওয়া। আর এই তাকওয়ার প্রতিফলন শুরু হয় একটি সুন্দর, সুস্থ এবং ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচনের মাধ্যমে। পশুর হাটের ভিড় আর দরদামের মাঝে অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে, কুরবানির পশুর কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও শারীরিক মানদণ্ড রয়েছে যা পূরণ না হলে ইবাদতটি অপূর্ণ থেকে যেতে পারে।
একটি আদর্শ কুরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাথমিক শর্ত হলো পশুর বয়স নিশ্চিত করা। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, উট অন্তত পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে বয়স দুই বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ছাগল, ভেড়া এবং দুম্বার ক্ষেত্রে বয়স অন্তত এক বছর হতে হবে। তবে ভেড়া বা দুম্বার বয়স যদি ছয় মাসও হয় কিন্তু দেখতে এক বছর বয়সীর মতো সুঠাম ও বড় দেখায়, তবে তা কুরবানি করা বৈধ। পশুর বয়স নির্ধারণের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো তার সামনের পাটির দাঁত পর্যবেক্ষণ করা। সাধারণত গরু বা মহিষের নিচের পাটির সামনের দুটি দাঁত পড়ে গিয়ে নতুন বড় দুটি দাঁত উঠলে বোঝা যায় তার বয়স দুই বছর হয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা এটিকে দুই দাঁত হওয়া বলে থাকেন। তবে দাঁত দেখে বয়স নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশুর সঠিক জন্ম তারিখ জানা থাকলে সেটিই বেশি নির্ভরযোগ্য।
পশুর শারীরিক সুস্থতা ও গঠন যাচাই করা কুরবানির অন্যতম প্রধান শর্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই পশুকে কুরবানি করতে নিষেধ করেছেন যার মধ্যে স্পষ্ট ত্রুটি রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ত্রুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যা থাকলে কুরবানি জায়েজ হবে না। প্রথমত, পশুটি যদি অন্ধ হয় এবং অন্ধত্ব স্পষ্ট বোঝা যায়। দ্বিতীয়ত, পশুটি মারাত্মক অসুস্থ হলে। তৃতীয়ত, পশুটি যদি পঙ্গু হয় এবং সে ঠিকমতো চলতে না পারে। চতুর্থত, পশুটি যদি এতোটা জীর্ণ বা হাড্ডিসার হয় যে তার হাড়ে মজ্জা অবশিষ্ট নেই। পশুর হাটে গিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে পশুটি স্বাভাবিকভাবে ঘাস বা খাবার খাচ্ছে কি না। অসুস্থ পশুর নাক সাধারণত শুকনো থাকে এবং কান নিচের দিকে ঝুলে থাকে। সুস্থ পশুর চোখ হবে উজ্জ্বল এবং তার শরীরের পশম হবে মসৃণ ও উজ্জ্বল। পশুর চামড়ায় কোনো ক্ষত বা বড় কোনো চর্মরোগ আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
একটি পশুর বাহ্যিক সৌন্দর্য কুরবানির মর্যাদাকে বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় দেখা যায় হাটে কিছু গরু বেশ চকচকে এবং অস্বাভাবিক শান্ত থাকে। ক্রেতাদের মনে রাখা উচিত যে, অসাধু ব্যবসায়ীরা অনেক সময় পশুকে দ্রুত মোটা-তাজা করার জন্য স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর হরমোন ইনজেকশন ব্যবহার করে থাকে। এমন পশু দেখতে অনেক মোটা মনে হলেও আসলে তা অসুস্থ এবং তার মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধরনের পশুকে চিনতে হলে তার পেছনের উরুর দিকে লক্ষ্য করতে হবে। যদি উরু অতিরিক্ত ফোলা থাকে এবং আঙুল দিয়ে চাপ দিলে গর্ত হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে এটি কৃত্রিমভাবে মোটা করা হয়েছে। সুস্থ পশু সাধারণত চটপটে হবে এবং চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকবে। নাক শুকানো বা মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা পড়া পশুর বড় কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।
শিং, লেজ এবং কানের সুস্থতাও পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পশুর যদি একটি শিং গোড়া থেকে উপড়ে যায় বা ভেঙে যায় এবং তার প্রভাব মস্তিষ্কে পড়ে, তবে সেই পশু কুরবানি করা অনুচিত। তবে শিংয়ের উপরের কিছু অংশ ভেঙে গেলে তা সমস্যায় পড়বে না। পশুর লেজ বা কানের অর্ধেকের বেশি অংশ কাটা থাকলে সেই পশুও কুরবানির জন্য অনুপযুক্ত। পশুর খুর পরীক্ষা করাও আবশ্যক। খুরে কোনো ঘা বা রোগ থাকলে সেই পশু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না এবং ব্যথায় কাতরাতে থাকে। হাটে পশুকে হাঁটিয়ে দেখা উচিত যে সে স্বাভাবিকভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছে কি না। অনেক সময় দূর থেকে পশু আনা-নেওয়ার সময় ট্রাকের চাপে পশুর হাড় ভেঙে যেতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা কঠিন হতে পারে। তাই কেনার আগে পশুর প্রতিটি অঙ্গ খুব কাছ থেকে দেখা একজন সচেতন ক্রেতার দায়িত্ব।
কুরবানি মূলত নিজের উপার্জিত হালাল অর্থের বিনিময় হতে হবে। যে পশুটি কেনা হচ্ছে সেটি যেন কোনো অন্যায় উপায়ে বা সুদের টাকায় কেনা না হয় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। পশুর ক্রয়মূল্য যাই হোক না কেন, মনের নিয়ত যেন থাকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। পশুর দাম নির্ধারণের সময় অহেতুক তর্কাতর্কি বা অহংকার প্রকাশ করা ইবাদতের গাম্ভীর্য নষ্ট করে। এছাড়া পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। হাটে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা পশুটি তৃষ্ণার্ত কি না বা সে কষ্ট পাচ্ছে কি না তা দেখা মানবিক দায়িত্ব। পশুকে বাড়ি আনার পর তার জন্য উপযুক্ত আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত। পশুর প্রতি ভালোবাসা থেকেই মূলত কুরবানির ত্যাগ সার্থক হয়।
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে অনেক মানুষ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে কুরবানির পশু সংগ্রহ করছেন। এটি একটি ভালো উদ্যোগ হলেও এক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন আছে। সরাসরি দেখে কেনার সুযোগ না থাকায় পশুর প্রকৃত স্বাস্থ্য ও বয়স সম্পর্কে ভুল তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনলাইন থেকে কেনার ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত বিক্রেতা নির্বাচন করা এবং পশুর লাইভ ভিডিও দেখে যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এছাড়া কুরবানি পরবর্তী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও এখন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের ভাবা দরকার। পশুকে জবেহ করার স্থানটি যেন পরিষ্কার থাকে এবং বর্জ্য যেন যত্রতত্র ফেলে রাখা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রতিটি মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। পশুর হাটে যাওয়ার সময় শারীরিক নিরাপত্তা এবং পকেটে রাখা অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, কুরবানির পশু নির্বাচন একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার অংশ। এটি কেবল হাটে গিয়ে দরদাম করে একটি জন্তু কিনে আনা নয়। এটি হলো আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। পশুর নিখুঁত বাছাই আমাদের এই ইবাদতকে পূর্ণতা দেয়। যে পশুটি নিজের কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং সুন্দর, সেটিই আল্লাহর পথে উৎসর্গ করা নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগেরই এক ক্ষুদ্র অংশ। পশু নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে সচেতনতা ও শরিয়তের জ্ঞান প্রয়োগ করলে একদিকে যেমন ইবাদত কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, অন্যদিকে সুস্থ পশু জবাই করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও হ্রাস পায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার কুরবানি কবুল করুন।
