ঈদুল আজহা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি বান্দার শর্তহীন আনুগত্য ও ত্যাগের এক অনন্য মহিমা। মুসলিম উম্মাহর এই দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসবে কোরবানি দেওয়ার মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তবে এই ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পশুর গুণগত মান ও শারীরিক সুস্থতা একটি প্রধান শর্ত।
আমরা যখন হাটে যাই, তখন আমাদের লক্ষ্য কেবল একটি পশু ক্রয় করা নয়, বরং এমন একটি উৎসর্গ বেছে নেওয়া যা শরীয়তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ এবং আল্লাহর দরবারে পেশ করার যোগ্য। কোরবানির পশু নির্বাচনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত মুমিনের তাকওয়া বা খোদাভীতির এক ব্যবহারিক পরীক্ষা।
পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি খেয়াল করতে হয় তা হলো পশুর বয়স। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে বয়স কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে এক বছর পূর্ণ হতে হবে।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ছাড় রয়েছে; যদি কোনো ভেড়া বা দুম্বার বয়স ছয় মাস হয় কিন্তু তাকে দেখতে পূর্ণ এক বছর বয়সী পশুর মতো স্বাস্থ্যবান মনে হয়, তবে সেটি কোরবানি করা জায়েজ। পশুর বয়স নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের দাঁত দেখার প্রচলিত পদ্ধতিটি অনুসরণ করা উচিত। সঠিক বয়সের পশু নির্বাচন না করলে কোরবানি শুদ্ধ হবে না, তাই এই বিষয়ে কোনো প্রকার অবহেলা করার সুযোগ নেই।
শারীরিক সুস্থতা কোরবানির পশুর দ্বিতীয় প্রধান মানদণ্ড। একটি পশু দেখতে খুব বড় বা সুন্দর হলেও যদি সেটি রোগাক্রান্ত হয়, তবে তা কোরবানির উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে পশুর চোখ উজ্জ্বল কি না, নাক দিয়ে জল ঝরছে কি না কিংবা পশুর আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না—তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
এমন পশু বেছে নেওয়া উচিত যা নিজের পায়ে হেঁটে চলতে পারে এবং অত্যন্ত দুর্বল বা জরাজীর্ণ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন আমরা যেন সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত পশু কোরবানি করি। পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকার অর্থ হলো সেটি আল্লাহর জন্য পেশকৃত একটি শ্রেষ্ঠ উপহার।
দৃশ্যমান ত্রুটিমুক্ত হওয়া কোরবানির পশু নির্বাচনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক। অন্ধ বা একচোখা পশু কোরবানি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। একইভাবে, যদি পশুর একটি পা পঙ্গু হয় বা খুব বেশি খোঁড়া থাকে যা তাকে সাবলীলভাবে হাঁটতে বাধা দেয়, তবে সেটি নির্বাচন করা যাবে না। কান বা লেজের একটি বড় অংশ (এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি) কাটা থাকলে সেই পশু কোরবানির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হয়। ইসলামে কোরবানির পশুর পূর্ণতাকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
আমরা যখন কাউকে কোনো উপহার দেই, তখন যেমন খুঁতহীন জিনিসটি খুঁজি, ঠিক তেমনি আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করা পশুটিও হতে হবে সব ধরনের শারীরিক ত্রুটি থেকে মুক্ত।
পশুর হৃষ্টপুষ্টতা এবং লালন-পালনের ধরনও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা পশুকে কৃত্রিমভাবে মোটা-তাজা করার জন্য ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। এই ধরনের পশু কোরবানি করা স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ধর্মীয় দিক থেকেও এটি অনুৎসাহিত। নিজের বাড়িতে বা প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘাস ও সাধারণ খাবার খেয়ে বড় হওয়া পশু কোরবানির জন্য সবচেয়ে উত্তম।
পশুটি যেন পরিচ্ছন্ন থাকে এবং তার ওপর কোনো নিষ্ঠুর আচরণ না করা হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহর কাছে পশুর মাংস বা রক্ত পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার মনের আন্তরিকতা এবং পরহেজগারিতা (সূরা আল-হজ্জ, ২২:৩৭)।
একটি সুন্দর গল্পের মতো করে যদি ভাবি, একজন পিতা যখন তার সন্তানকে নিয়ে হাটে যান এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেরা পশুটি খুঁজেন, তখন তিনি মূলত তার সন্তানকে একটি আজীবন শিক্ষা দিচ্ছেন। তিনি শেখাচ্ছেন যে আল্লাহর জন্য কিছু দিতে হলে তা হতে হয় সর্বোত্তম।
এই শিক্ষাটিই হলো কোরবানির মূল সৌন্দর্য। বাহ্যিক আড়ম্বর বা কে কার চেয়ে কত দামী পশু কিনল, সেই প্রতিযোগিতা নয় বরং কতটুকু নিখুঁত ও আন্তরিকতার সাথে আমরা পশুটি নির্বাচন করছি—সেটাই আসল। হাট থেকে ফেরার সময় পশুটির প্রতি যে মমতা জন্মায়, তা মূলত ত্যাগের প্রস্তুতি। তাই কোরবানির পশু নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে সচেতনতা এবং ধর্মীয় বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য।
