রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

আহারের সময় যে কাজগুলো করতে নিষেধ করেছেন বিশ্বনবী সঃ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

আহারের সময় যে কাজগুলো করতে নিষেধ করেছেন বিশ্বনবী সঃ

ইসলাম কেবল ইবাদত-বন্দেগির নাম নয় বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো কাজের মধ্যেও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। আহার গ্রহণ বা খাবার খাওয়ার বিষয়টি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ সঃ এই সাধারণ কাজটিকেও ইবাদতে পরিণত করার পথ দেখিয়ে গেছেন। রাসুল সঃ খাবারের সময় বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কাজ করার আদেশ দিয়েছেন এবং কিছু কাজ থেকে বিরত থাকতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এই নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করলে খাবারের মধ্যে কেবল শারীরিক পুষ্টিই নয় বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ বরকতও লাভ করা সম্ভব।

খাবার শুরু করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আল্লাহর নাম স্মরণ করা। রাসুল সঃ খাবারের শুরুতে ‍‍`বিসমিল্লাহ‍‍` বলার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি কেউ শুরুতে আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায় তবে মনে পড়ার সাথে সাথে ‍‍`বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু‍‍` পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সহীহ আল-বুখারী, ৫৩৭৬)। একইসঙ্গে আহার গ্রহণের আগে হাত ধুয়ে পরিষ্কার করা একটি সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি যা সুন্নাহরও অংশ। রাসুল সঃ ডান হাত দিয়ে খাওয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাম হাত দিয়ে শয়তান খাবার গ্রহণ করে বলে তিনি উম্মতকে সতর্ক করেছেন এবং সর্বাবস্থায় ডান হাত ব্যবহারের আদেশ দিয়েছেন (সহীহ মুসলিম, ২০২০)। এটি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয় বরং এটি শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতীক।

আহার গ্রহণের সময় দস্তরখানের সামনের অংশ থেকে খাবার খাওয়া রাসুল সঃ-এর অন্যতম প্রধান নির্দেশনা। বড় পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হলে চারপাশ থেকে না খেয়ে নিজের কাছের দিক থেকে খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন যে বরকত পাত্রের মাঝখান থেকে নাজিল হয় (সহীহ আল-বুখারী, ৫৩৭৬)। এছাড়া খাবারের কোনো দোষ ত্রুটি খোঁজা বা সমালোচনা করা থেকে তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। যদি কোনো খাবার পছন্দ হতো তবে তিনি তা গ্রহণ করতেন আর পছন্দ না হলে চুপচাপ সরিয়ে রাখতেন কিন্তু কখনো খাবারের সমালোচনা করতেন না (সহীহ আল-বুখারী, ৫৪০৯)। বর্তমান সময়ে অনেকে খাবারের স্বাদ বা মান নিয়ে আক্ষেপ করেন যা রাসুল সঃ-এর আদর্শের পরিপন্থী।

বসে খাবার খাওয়া এবং হেলান দিয়ে আহার না করা ছিল রাসুল সঃ-এর অন্যতম অভ্যাস। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে তিনি হেলান দিয়ে খাবার গ্রহণ করেন না (সহীহ আল-বুখারী, ৫৩৯৮)। হেলান দিয়ে খেলে পাকস্থলীর ওপর চাপ পড়ে এবং হজম প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে বলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও প্রমাণিত। এছাড়া খাবার সময় অতিরিক্ত উদরপূর্তি করে খাওয়াকে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন (সুনান আত-তিরমিযী, ২৩৮০)। এই পরিমিতিবোধ মানুষকে অলসতা ও বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করে।

খাবার শেষে মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা রাসুল সঃ-এর নিয়মিত আমল ছিল। খাবার শেষ করে ‍‍`আলহামদুলিল্লাহ‍‍` বলা আল্লাহর পক্ষ থেকে অফুরন্ত নিয়ামতের শোকরিয়া হিসেবে গণ্য হয়। যারা খাবার শেষে আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তাদের ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন (সহীহ মুসলিম, ২৭৩৪)। এছাড়া খাবারের পর আঙুল চেটে খাওয়া বা পাত্র পরিষ্কার করে খাওয়া বরকতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুল সঃ বলেছেন যে খাবারের কোন অংশে বরকত আছে তা মানুষ জানে না তাই কোনো খাবার অপচয় করা উচিত নয়। সম্মিলিতভাবে বা পরিবারের সবাই মিলে খাবার খাওয়ার মধ্যেও তিনি বরকত নিহিত থাকার কথা বলেছেন।

সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে রাসুল সঃ-এর এই শিক্ষাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি খাবার খাওয়ার সময় একে অপরের সাথে হৃদ্যতা বজায় রাখার এবং ছোটদের প্রতি মমতা প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন। দস্তরখানে বসে বড়দের আগে খাবার শুরু করতে দেওয়া এবং ছোটদের খাবার শিখিয়ে দেওয়া শিষ্টাচারের অংশ। রাসুল সঃ-এর এই আদেশ ও নিষেধগুলো কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয় বরং এটি সুস্থ, সুশৃঙ্খল ও সুন্দর জীবন যাপনের জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত গাইডলাইন। আমরা যদি প্রতিদিনের আহারে এই সুন্নাহগুলো মেনে চলি তবে আমাদের প্রতিটি লোকমা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হবে।

banner
Link copied!