মক্কা নগরী থেকে প্রায় বিশ থেকে বাইশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে তায়েফের মহাসড়ক ঘেঁষে অবস্থিত এক বিশাল ঐতিহাসিক মরু সমতলভূমির নাম আরাফাত। তিন দিকে পাহাড় দিয়ে পরিবেষ্টিত এই ঐতিহাসিক ময়দানের ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। আরবি ‘আরাফাহ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কোনো কিছু জানা, চেনা বা নিজের দোষ স্বীকার করা। ইসলামি ঐতিহ্য ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এই ময়দানেই আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা হজরত হাওয়া (আ.) পরস্পরকে চিনতে পেরেছিলেন এবং একত্রিত হতে পেরেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মহা-মিলনের স্মৃতি ধারণ করেই এই বিস্তীর্ণ পুণ্যভূমির নামকরণ করা হয়েছে আরাফাত ময়দান।
পবিত্র হজের তিনটি প্রধান ফরজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় রুকন হলো এই আরাফার ময়দানে অবস্থান করা।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় একে ‘উকুফে আরাফা’ বলা হয় এবং এটি হজের এমন একটি মৌলিক স্তম্ভ যা বাদ পড়লে কোনোভাবেই হজ আদায় হবে না। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, আরাফাই হলো মূল হজ। মুসনাদে আহমদ ও সুনানে নাসায়ির বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রা.) উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যখন কিছু মানুষ হজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে ব্যক্তি মুজদালিফার রাত পাওয়ার পূর্বে আরাফার রাত বা দিন পেয়েছে, তার হজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এর দ্বারা ফিকহবিদ ও মুফাসসিরগণ একমত হয়েছেন যে, এই নির্ধারিত স্থানে সঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়া ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তির হজের আইনি ও ধর্মীয় বৈধতা থাকে না।
হজের ফরজ পালনের সময়সূচী ও ভৌগোলিক সীমানার সতর্কতা
ইসলামি শরিয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী, ৯ জিলহজ ফজরের নামাজের পরপরই মিনা থেকে একনিষ্ঠ তাওবা ও ইস্তিগফারের নিয়ত নিয়ে আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে রওনা হওয়া সুন্নত। তবে এই হজের ফরজ পালনের জন্য একটি বাধ্যতামূলক সময়সীমা রয়েছে, যা প্রত্যেক হাজিকে অবশ্যই নিখুঁতভাবে মেনে চলতে হবে। ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার পর বা জোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়া থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও আরাফাতের নির্ধারিত সীমানার ভেতরে অবস্থান করা ফরজ। যদি কোনো হাজি সূর্যাস্তের পূর্বে এই ময়দান ত্যাগ করেন, তবে তার ওয়াজিব তরক হবে এবং হজের ওপর মারাত্মক ক্ষতি নেমে আসবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সূর্য পুরোপুরি অস্ত যাওয়ার পর মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, যা মূলত জাহেলি যুগের পৌত্তলিক ও মুশরিকদের পুরনো আচারের সঙ্গে মুসলমানদের ইবাদতের স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করে।
অনেকে মনে করেন কেবল জাবালে রহমত পাহাড়ের ওপর ওঠাই বুঝি আরাফার মূল ইবাদত, যা একটি অত্যন্ত সাধারণ ভুল ধারণা। প্রকৃতপক্ষে আরাফা একটি বিস্তৃত সমতল এলাকা এবং এর যেকোনো জায়গায়, এমনকি নিজের তাঁবুর ভেতরে অবস্থান করলেও ফরজ নিখুঁতভাবে আদায় হয়ে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি চরম প্রশাসনিক ও ধর্মীয় সতর্কতা রয়েছে যা অবহেলা করলে পুরো হজ বাতিল হয়ে যেতে পারে। আরাফাতের সম্পূর্ণ পরিসীমা নির্ধারণ করে চারপাশ দিয়ে বড় বড়➘ পিলার বা স্তম্ভ স্থাপন করা আছে, যার বাইরে অবস্থান করলে উকুফ সম্পন্ন হবে না। বিশেষ করে ‘উরানা উপত্যকা’ বা ওয়াদি উরানা সম্পূর্ণভাবে আরাফার সীমানার বাইরে অবস্থিত, তাই কোনো হাজি ভুলবশত সেখানে অবস্থান করলে তার হজের প্রধান ফরজ আদায় হবে না। মসজিদে নামিরার কাছাকাছি অবস্থান করা মোস্তাহাব বা উত্তম হলেও সেখানে জায়গা না পেলে সীমানার ভেতরে যেকোনো নিরাপদ স্থানে অবস্থান করা সম্পূর্ণ বৈধ।
ময়দানের আমলসমূহ এবং মুজদালিফায় গন্তব্যের নিয়ম
আরাফার দিনে জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করার একটি বিশেষ নিয়ম ইসলামি শরিয়তে রয়েছে, যাকে ‘জমা তাকদিম’ বলা হয়। জোহরের আজানের আগেই সুন্নতি তরিকায় গোসল সম্পন্ন করে মসজিদে নামিরা থেকে প্রদত্ত ঐতিহাসিক খুতবা শোনা উত্তম, যদিও এটি বাধ্যতামূলক কোনো বিষয় নয়। এরপর জোহরের ওয়াক্তে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে কসর করে অর্থাৎ দুই রাকাত করে মোট চার রাকাত একটানা আদায় করতে হয়। এই বিশেষ ইবাদত সম্পন্ন করার পর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টুকু হলো আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ফেলে দোয়া করার সবচেয়ে মূল্যবান ও সর্বোত্তম সময়। এই দিনে হাজিদের জন্য রোজা রাখা মাকরুহ, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে সবার সামনে দুধ পান করে রোজা না রাখার আদর্শ স্থাপন করেছিলেন যাতে হাজিরা দোয়ার জন্য পর্যাপ্ত শারীরিক শক্তি পান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরাফার ময়দানে কেবলামুখী হয়ে দুই হাত উঁচূ করে বিনয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে দোয়াটি পাঠ করতেন, তা হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে। সুনানে তিরমিজি ও মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।’ এই জিকিরের পাশাপাশি বেশি বেশি তালবিয়া, ইস্তিগফার এবং দুরুদ শরিফ পাঠ করা এই দিনের অন্যতম প্রধান আমল। সূর্যাস্তের পর হাজিদের পরবর্তী গন্তব্য হলো মুজদালিফা। এ ক্ষেত্রে একটি জরুরি মাসয়ালা হলো, সূর্যাস্তের পর আরাফায় মাগরিবের আজান হলেও সেখানে কোনোভাবেই মাগরিবের নামাজ পড়া যাবে না। আরাফায় মাগরিব পড়া হজের সুন্নতের পরিপন্থী এবং মাগরিব ও এশা—এই দুই ওয়াক্তের নামাজ একত্রে মুজদালিফায় পৌঁছে একই আজান ও দুটি ইকামতে পরপর আদায় করাই ইসলামি শরিয়তের শাশ্বত বিধান। এই পবিত্র ময়দান মূলত কেয়ামতের হাশরের ময়দানের মহাসমাবেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে কোটি মানুষ একই শুভ্র পোশাকে আল্লাহর ক্ষমার আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন।
তথ্যসূত্র: সুনানে নাসায়ি ও সুনানে তিরমিজি
