ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এক ইবাদত হলো কোরবানি। এটি মূলত মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজের প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করার এক অনন্য মাধ্যম। প্রতি বছর ঈদুল আজহার নির্ধারিত দিনগুলোতে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ওপর পশু কোরবানি করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের স্মৃতি বহনকারী এই ইবাদতটি কেবল পরকালীন সওয়াবই নয়, বরং মুমিনের তাকওয়া বা খোদাভীতির এক বড় পরীক্ষা।
তবে কোরবানি সবার ওপর ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোরবানি কেবল সেই ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব, যিনি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান এবং যার কাছে জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত ‘নেসাব’ পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা ব্যক্তিদের সতর্ক করেছেন (ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩১২৩)। এই নেসাব হলো সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা ব্যবসার সম্পদ। বর্তমানে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, কোরবানি দেওয়ার সময় কেউ যদি ঋণগ্রস্ত থাকেন, তবে তার জন্য করণীয় কী হবে।
ইসলামি ফিকহবিদরা এ বিষয়ে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যদি কোনো ব্যক্তি সাময়িকভাবে ঋণগ্রস্ত থাকেন এবং কোরবানির দিনগুলোতে তার হাতে থাকা মোট সম্পদ থেকে চলতি বছর পরিশোধযোগ্য ঋণের অংশ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্টাংশ নেসাব পরিমাণ না থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে না। অর্থাৎ, ঋণের বোঝা যদি ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতাকে নেসাবের নিচে নামিয়ে দেয়, তবে ইসলাম তাকে এই আর্থিক ইবাদত থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। কারণ ইসলামে সামর্থ্যের বাইরে কোনো বিধান কারো ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় না।
ঋণ থাকলেই যে কোরবানি দেওয়া যাবে না—বিষয়টি এমন নয়।
যদি কারো কাছে বড় অংকের ঋণ থাকে, কিন্তু তার সম্পদের পরিমাণ এতই বেশি যে চলতি মেয়াদের ঋণ পরিশোধের পরও তার কাছে নেসাব পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে যায়, তবে তাকে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে। ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘বাদায়িউস সানায়ি’ ও ‘আল-ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যা’ অনুযায়ী, মূল বিবেচ্য বিষয় হলো পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দেওয়ার পর ব্যক্তির হাতে থাকা নিট সম্পদের পরিমাণ। সুতরাং কারো ওপর দীর্ঘমেয়াদী কিস্তির ঋণ থাকলেও যদি তার বর্তমান নগদ বা গচ্ছিত সম্পদ নেসাব স্পর্শ করে, তবে কোরবানি তার জন্য বাধ্যতামূলক।
কোরবানি একটি আর্থিক ইবাদত হওয়ায় এর প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। অনেক সময় মানুষ সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য ঋণ করেও কোরবানি দেন, যা শরিয়তে নির্দেশিত নয়। আবার কারো কাছে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেবল ঋণের অজুহাতে ওয়াজিব কোরবানি ত্যাগ করাও গুনাহের কাজ। একজন সচেতন মুসলমানের উচিত তার আর্থিক অবস্থার সঠিক পর্যালোচনা করে ফিকহি মাসয়ালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের ইবাদতগুলোকে কবুল করুন।
