বিশ্বজুড়ে একটি পরিসংখ্যান দীর্ঘকাল ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে যে নারীরা গড়ে পুরুষদের তুলনায় বেশি বছর বেঁচে থাকেন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য রেকর্ডগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী ও পুরুষের এই আয়ুষ্কালের ব্যবধান কেবল উন্নত দেশেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও একইভাবে বিদ্যমান। ২০১৬ সালে ডব্লিউএইচও-র একটি বড় পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছিল যে বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৭২ বছর। তবে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনে দেখা যায়, নারীদের গড় আয়ু প্রায় ৭৪ বছর দুই মাস এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬৯ বছর আট মাস। এমনকি শতবর্ষী মানুষের তালিকায় চোখ রাখলে দেখা যায় তাদের একটি বিশাল অংশই নারী।
নারী ও পুরুষের এই আয়ুষ্কালের ব্যবধানের মূলে রয়েছে জিন ও হরমোনের প্রভাব।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের জিনগত গঠন দীর্ঘায়ু হওয়ার এই দৌড়ে নারীদের বড় সুবিধা দেয়। নারীদের শরীরে দুটি এক্স (X) ক্রোমোজোম থাকে, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি এক্স এবং একটি ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম থাকে। এর ফলে নারীদের কোনো একটি ক্রোমোজোমে জিনগত ত্রুটি দেখা দিলে অন্য এক্স ক্রোমোজোমটি অনেক সময় সেই ত্রুটি সামলে নেয় বা ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু পুরুষদের সেই ব্যাকআপ সুবিধা নেই, কারণ তাদের ওয়াই ক্রোমোজোমটি জিনগতভাবে তুলনামূলক ছোট। এই কাঠামোগত পার্থক্যের কারণেই নারীরা রোগ প্রতিরোধে বা শারীরিক জটিলতায় বেশি সহনশীল হয়ে থাকেন।
জীবনযাত্রার শুরুর দিকে এমনকি ভ্রূণ অবস্থাতেও এই পার্থক্যের প্রতিফলন ঘটে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে পুরুষ ভ্রূণের মৃত্যুহার নারী ভ্রূণের তুলনায় কিছুটা বেশি। জন্মের সময়ও ছেলে শিশুদের কিছু বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়, যার মধ্যে রয়েছে বড় আকার ও প্রসবকালীন জটিলতা। এই প্রাথমিক শারীরিক চ্যালেঞ্জগুলো জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতেও প্রভাব ফেলে। শৈশব ও কৈশোরে মেয়ে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছেলেদের তুলনায় কিছুটা শক্তিশালী থাকে বলে অনেক শিশু বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
হরমোনের ভূমিকাও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক হয়ে কাজ করে। পুরুষদের শরীরে থাকা টেস্টোস্টেরন হরমোন তাদের শক্তি ও পেশিবহুল শরীরের জন্য দায়ী হলেও এটি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সঙ্গেও যুক্ত। এই হরমোনের প্রভাবে অনেক পুরুষ দ্রুতগামী জীবনযাপন, বিপজ্জনক পেশা বা শারীরিক দুর্ঘটনায় বেশি আক্রান্ত হন। অন্যদিকে নারীদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন হরমোন হৃদযন্ত্রকে রক্ষা করতে ঢাল হিসেবে কাজ করে। ইস্ট্রোজেন রক্তে ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।
তবে কেবল জীববিজ্ঞান নয়, জীবনযাত্রার ধরনও পুরুষদের আয়ু কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে।
ধূমপান, মদ্যপান এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের মতো অভ্যাসগুলো বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতি উদাসীনতা অনেক পুরুষকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তবে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, নারীরা বেশি দিন বাঁচলেও তাদের জীবন সবসময় রোগমুক্ত হয় না। দেখা যায় নারীরা দীর্ঘ সময় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভোগেন এবং পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। অর্থাৎ তারা বেশি বাঁচলেও জীবনের শেষ দিনগুলোতে স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ তাদের অনেক বেশি মোকাবিলা করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে ভবিষ্যতে নারী ও পুরুষের আয়ুষ্কালের এই ব্যবধান ধীরে ধীরে কমে আসবে। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, হৃদরোগের আধুনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে অনেক দেশেই পুরুষদের গড় আয়ু দ্রুত বাড়ছে। তবে জিন ও হরমোনের যে প্রাকৃতিক প্রভাব রয়েছে তা সবসময়ই একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বজায় রাখবে বলে মনে করা হয়। আয়ুষ্কালের এই ব্যবধানটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের জটিল রসায়ন এবং সামাজিক আচরণের এক বৈচিত্র্যময় প্রতিফলন।
