শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

লাইক্রা পরিহিত পর্যটকদের দাপট: বিভক্ত স্পেনের বিখ্যাত দ্বীপ মায়োর্কা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম

লাইক্রা পরিহিত পর্যটকদের দাপট: বিভক্ত স্পেনের বিখ্যাত দ্বীপ মায়োর্কা

Ai - ছবি

স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ মায়োর্কার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় পাহাড়ি রাস্তাগুলোতে এখন এক বিচিত্র দৃশ্য চোখে পড়ে। উজ্জ্বল লাইক্রা পোশাক পরা শত শত সাইক্লিস্ট সোলারের আঁকাবাঁকা পথ ধরে দেইয়া গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছেন। একদিকে প্রাচীন জলপাই বাগান আর অন্যদিকে নীল সমুদ্রের এই মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের জন্য স্বর্গীয় হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য তা ক্রমেই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ি খাড়া ঢালে সাইক্লিস্টদের গতি কমে গেলে পেছনে আটকা পড়ে বাস, ট্রাক আর ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি, যা থেকে তৈরি হয় তীব্র যানজট।

মায়োর্কার এই চিত্র এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা।

প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সাইক্লিস্ট এই দ্বীপে ঘুরতে আসেন। মৃদু জলবায়ু আর মসৃণ রাস্তার টানে আসা এই পর্যটকদের জন্য দ্বীপে ১ হাজার ৭৬ মাইল দীর্ঘ ১৬টি সুনির্দিষ্ট সাইক্লিং রুট রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক পর্যটককে সেবা দিতে এখানে অন্তত ১২০টি বিশেষায়িত হোটেল গড়ে উঠেছে। যদিও মায়োর্কার বার্ষিক ১ কোটি ৩৫ লাখ পর্যটকের তুলনায় এই সংখ্যাটি খুব বেশি নয়, তবুও তারা দ্বীপের অফ-সিজন অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ৩০ কোটি ইউরো যোগ করেন।

তবে এই অর্থনৈতিক স্বস্তির পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও দানা বাঁধছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এখন প্রায়ই সাইক্লিস্টদের কারণে সৃষ্ট যানজটের ভিডিও দেখা যায়। অভিযোগ উঠেছে যে, অনেক পর্যটক ট্রাফিক সিগন্যাল মানেন না এবং বড় দলে চলাচলের সময় রাস্তার নিয়ম তোয়াক্কা করেন না। এমনকি গ্রামের ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে তাদের জটলা এবং সাইকেল রাখার বিশৃঙ্খল পদ্ধতি স্থানীয়দের দৈনন্দিন চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।

শিষ্টাচার নিয়ে এই বিতর্ক এখন চরমে।

দ্বীপের পর্যটন কর্মকর্তারা অবশ্য ইতিবাচক দিকগুলোই বড় করে দেখছেন। বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের পর্যটন মহাপরিচালক মিগুয়েল রোসেলো জানিয়েছেন, সাইক্লিং পর্যটন দ্বীপের অর্থনীতিকে সারাবছর সচল রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ‍‍`মায়োর্কা ৩১২‍‍` ইভেন্টটি এখন বড় ধরণের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী অংশ নেন। হোটেল ব্যবসায়ীদের মতে, সাইক্লিস্টরা দীর্ঘ সময় দ্বীপে অবস্থান করেন এবং তারা অন্য পর্যটকদের তুলনায় বেশি খরচ করেন।

প্লায়া ডি মুরো হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পেপে ডি লুনা জানান, এই পর্যটকরা কেবল নিজেরা আসেন না, প্রায়ই পরিবার এবং বন্ধুদের নিয়ে আসেন। তবে সোলারের মতো ছোট গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের দাবি, অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরু রাস্তাগুলোতে গাড়ি এবং সাইকেলের সহাবস্থান এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় এক ক্যাফে মালিকের মতে, সাইক্লিস্টরা সমস্যার মূল নয়, বরং দ্বীপের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অনুযায়ী রাস্তাঘাট বা গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়াই মূল সমস্যা।

দিনের শেষে যখন পাহাড়ী রাস্তার যানজট কমে আসে, তখন মায়োর্কা তার চিরচেনা শান্ত রূপ ফিরে পায়। কিন্তু গ্রীষ্মের মূল মৌসুমে এই চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাইক্লিস্ট বনাম স্থানীয়দের এই দ্বন্দ্ব আসলে মায়োর্কার বৃহত্তর সংকটেরই একটি অংশ—যেখানে দ্বীপটি তার জনপ্রিয়তার ভার সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

banner
Link copied!