মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় যাওয়ার প্রধান পথে সৃষ্টি হওয়া বিশাল এক তুষার বাধা বা বরফখণ্ড অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছে নেপালের একদল দক্ষ পর্বতারোহী। এর মাধ্যমে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা শত শত আরোহীর জন্য পথটি উন্মুক্ত হলো। বুধবার সকালে নেপালি আরোহীদের ওই বিশেষ দলটি বিপজ্জনক বরফখণ্ড বা `সেরাক` পেরিয়ে দড়ি এবং মই স্থাপন করতে সক্ষম হয়। রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই বিশাল বরফখণ্ডের কারণে এভারেস্টের একমাত্র ব্যবহারযোগ্য পথটি বন্ধ হয়ে ছিল। ফলে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে শত শত আরোহী এবং তাদের গাইডরা আটকা পড়েছিলেন। এখন এই নতুন স্থাপিত দড়ি ব্যবহার করে আরোহীরা চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করতে পারবেন।
তবে পথটি খুলে গেলেও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন এক আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। এবছর এভারেস্ট আরোহণের জন্য রেকর্ড সংখ্যক অনুমতিপত্র বা পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। ফলে চূড়ার কাছাকাছি এলাকায় ভয়াবহ `ট্রাফিক জ্যাম` বা ভিড় তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা। নেপাল সরকার এ বছর প্রায় ৫০০ বিদেশি পর্বতারোহীকে অনুমতি দিয়েছে। সাধারণত প্রতিটি বিদেশি আরোহীর সঙ্গে অন্তত একজন করে নেপালি গাইড থাকেন, যাদের কোনো পারমিটের প্রয়োজন হয় না। সেই হিসেবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ১,০০০ আরোহী ৮,৮৪৯ মিটার উচ্চতার এই শৃঙ্গ জয়ের জন্য রওনা দেবেন। সীমিত সময়ের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক আরোহীর পদচারণা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পর্বতারোহী পূর্ণিমা শ্রেষ্ঠা, যিনি ষষ্ঠবারের মতো এভারেস্ট জয়ের চেষ্টা করছেন, তিনি জানান যে এ বছর রুট খুলতে দেরি হওয়ায় অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক মানুষকে আরোহণ করতে হবে, যা ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত এভারেস্ট আরোহণের প্রধান মৌসুম থাকে। কিন্তু এবার বেইজ ক্যাম্প থেকে ওপরের দিকে যাওয়ার পথে একটি বিশাল এবং অস্থিতিশীল বরফখণ্ড বা `সেরাক` পথ আটকে দিয়েছিল। এই বাধা অতিক্রম করা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর আগে এই সপ্তাহেই চার নম্বর ক্যাম্প থেকে চূড়া পর্যন্ত দড়ি টানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত বুধবার নেপালি শেরপাদের একটি অভিজ্ঞ দল এই অসাধ্য সাধন করেছে।
এ বছর চীনের তিব্বত সীমান্ত দিয়ে উত্তর দিকের রুটটি বিদেশি আরোহীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে দক্ষিণ দিকের রুট বা নেপাল অংশ দিয়ে আরোহীদের চাপ আরও বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে নেপাল কর্তৃপক্ষ এবং অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো আরোহীদের আরোহণের সময় ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। নেপাল এক্সপেডিশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ঋষি রাম ভাণ্ডারী জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন দলের সাথে সমন্বয় করছেন যাতে সবাই একই সময়ে চূড়ায় ওঠার চেষ্টা না করে। বেইজ ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় ২,০০০ মানুষ অবস্থান করছেন, যার মধ্যে অনেক আরোহী অঞ্চলের অন্যান্য পাহাড় জয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গত দুই সপ্তাহে এভারেস্টের প্রস্তুতিমূলক অভিযানের সময় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বিজয় ঘিমিরে, যিনি নেপালের দলিত সম্প্রদায় থেকে আসা প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী ছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী এই আরোহী উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় ভুগে প্রাণ হারান। এছাড়া সোমবার ৩ নম্বর ক্যাম্পের কাছে ফাটলে পড়ে ২১ বছর বয়সী ফুরা গ্যালজেন শেরপা মারা যান। এর আগে ৩ মে বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয় ৫১ বছর বয়সী লাকপা ডেন্ডি শেরপার। এভারেস্টে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান ভিড় এবং পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।
