হজ ও ওমরাহ ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত যা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শৃঙ্খলিত নিয়মের ওপর ভিত্তি করে পালিত হয়। দীর্ঘ এই সফরে শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের মাঝে হাজিদের পক্ষ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অসাবধানতাবশত কিছু বিচ্যুতি ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ইসলামি শরিয়ত এই মানবিক সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য বিশেষ প্রতিবিধান বা কাফফারার ব্যবস্থা রেখেছে। আলেমদের মতে হজের শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে এই জরিমানা বা প্রতিবিধানের নিয়মগুলো জানা প্রতিটি হাজির জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব। হজে সাধারণত তিন ধরনের ভুল হতে পারে যার মধ্যে ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ করা, হজের ওয়াজিব পালনে ত্রুটি এবং হারাম শরিফের পবিত্রতা লঙ্ঘন অন্যতম।
ইহরাম বাঁধার পর একজন মুমিনের ওপর কিছু কাজ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় যার অন্যথা হলে জরিমানা ওয়াজিব হয়। পোশাক সংক্রান্ত ত্রুটির ক্ষেত্রে পুরুষদের জন্য সেলাই করা কাপড় পরা নিষিদ্ধ। যদি কেউ টানা ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় সেলাই করা পোশাক পরে থাকেন তবে তাকে জরিমানা হিসেবে ‘দম’ বা একটি ছাগল বা দুম্বা জবেহ করতে হবে। তবে সময়টি যদি ১২ ঘণ্টার কম হয় সে ক্ষেত্রে কেবল ‘সদকাতুল ফিতর’ সমপরিমাণ অর্থ দান করলেই তা আদায় হয়ে যাবে। একই নিয়ম মাথা বা মুখ ঢেকে রাখার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও শরিয়তের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। শরীরের বড় কোনো অঙ্গে বা পোশাকে বেশি মাত্রায় সুগন্ধি ব্যবহার করলে দম ওয়াজিব হয়। এমনকি সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা টিস্যু ব্যবহারও জরিমানার আওতাভুক্ত হতে পারে।
হজ ও ওমরাহর ওয়াজিব কাজগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তা সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানার বিধান রয়েছে। ওমরাহর তাওয়াফ যদি কেউ অজু ছাড়া বা অপবিত্র অবস্থায় সম্পন্ন করেন তবে তার ওপর দম ওয়াজিব হয়। অন্যদিকে হজের ফরজ তাওয়াফ বা তাওয়াফে জিয়ারত যদি কেউ গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় করেন তবে তাকে ‘বাদানা’ বা একটি পূর্ণ গরু বা উট জবেহ করতে হবে। তবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে পবিত্র হয়ে পুনরায় সেই তাওয়াফ করে নিলে এই বড় জরিমানা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এছাড়া কঙ্কর নিক্ষেপে অবহেলা বা হজের কাজগুলোর নির্দিষ্ট ক্রম রক্ষা না করলেও দম ওয়াজিব হওয়ার বিধান রয়েছে। ১০ জিলহজ কঙ্কর মারার আগে মাথা মুণ্ডন করা বা কোরবানির আগে চুল কাটাও জরিমানাযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
জরিমানা আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট স্থান ও পাত্রের বিষয় রয়েছে যা হাজিদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। জরিমানা মূলত তিন প্রকারের হয় যার মধ্যে দম, বাদানা এবং সদকা অন্যতম। মনে রাখতে হবে যে দম এবং বাদানার পশু অবশ্যই হারামের সীমানার ভেতরে জবেহ করতে হবে এবং সেই গোশত কেবল হারাম এলাকার অভাবী ও মিসকিনদের হক। জরিমানা দাতা বা তার নিজের পরিবারের জন্য এই গোশত খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে সাধারণ সদকা নিজ দেশে বা বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের গরিবদের দিলেও তা শরিয়ত মোতাবেক আদায় হয়ে যাবে। অসুস্থতা বা তীব্র শীতের মতো অনিবার্য কারণে যদি কেউ ভুল করে ফেলেন তবে দমের পরিবর্তে তিনটি রোজা রাখা বা ছয়জন মিসকিনকে সদকা দেওয়ার বিকল্প সুযোগ রয়েছে।
হজের এই সফরে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একাগ্রতার সাথে প্রতিটি আমল সম্পন্ন করা। ভুল ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত জরিমানা উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হলেও অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কোনো গুনাহ হবে না বলে ইসলামি চিন্তাবিদরা মত দিয়েছেন। একই ধরনের ভুল একাধিকবার করলে দণ্ড আদায়ের আগে একটি জরিমানাই যথেষ্ট হতে পারে তবে ভিন্ন ভিন্ন ভুলের জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা দিতে হবে। নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে জরিমানা না দিয়ে নির্ভরযোগ্য কিতাব অনুসরণ বা বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হজ গাইডলাইন ও কিতাবুল মানাসেক অনুযায়ী হজের ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করে ইবাদতকে নিখুঁত করার মাধ্যমে ‘হজ্জে মাবরুর’ বা কবুল হজের আশা করা যায়।
