ইরানের রাজধানী তেহরানের পূর্ব দিকে অবস্থিত পরদিস এলাকায় এক রাতের ব্যবধানে টানা নয়টি ছোট মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। বুধবার ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহর নিউজ এই তথ্য নিশ্চিত করার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্পের আশঙ্কায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এই কম্পনগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে এটি একটি বড় দুর্যোগের পূর্বসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে তেহরানের মতো অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরের কাছে এই ধরনের ঘনঘন কম্পন মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটের অস্থিরতাকেই নির্দেশ করছে।
তদন্তে জানা গেছে যে এই কম্পনগুলোর কেন্দ্রস্থল ছিল মোশা ফল্ট বা চ্যুতিরেখা যা ইরানের অন্যতম সক্রিয় একটি ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ফল্টটি ইরানের রাজধানী থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গতরাতের এই কম্পনগুলোর মধ্যে একটির মাত্রা রিখটার স্কেলে ৪.৬ রেকর্ড করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে মৃদু কম্পন হলেও আতঙ্কিত বাসিন্দারা অনেক ক্ষেত্রে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তেহরানের ভূ-প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে শহরটি উত্তর তেহরান, মোশা এবং রেই নামক তিনটি প্রধান সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর বা কাছাকাছি অবস্থিত যা একে বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটিতে পরিণত করেছে।
প্রখ্যাত ইরানি ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহদি জারে এই ঘটনা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে এই ধরনের ছোট ছোট কম্পন কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাটির নিচে জমে থাকা শক্তি নিঃসরণ করে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। তবে বিপরীতভাবে এটি বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের আগে ‘ফোর শক’ বা প্রাক-কম্পন হিসেবেও কাজ করতে পারে। জারে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে তেহরানের বর্তমান নগর পরিকাঠামো এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এই ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার মতে অপেক্ষাকৃত মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও এই জনবহুল শহরে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে কারণ এখানকার অনেক ভবনই ভূমিকম্প সহনশীল নয়।
তেহরান বর্তমানে ১৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের বাসস্থান যা এই সংকটের গভীরতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে যদি বড় মাত্রার কোনো কম্পন এই অঞ্চলে আঘাত হানে তবে উদ্ধার তৎপরতা চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। শহরের ঘিঞ্জি রাস্তাঘাট এবং ভঙ্গুর অবকাঠামো জরুরি সেবাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এর আগে ২০০৩ সালে ইরানের ঐতিহাসিক বাম শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো ইরানিদের মনে টাটকা থাকায় তেহরানের আশপাশে যেকোনো মৃদু কম্পন জনমনে চরম ভীতি তৈরি করে।
বর্তমানে ইরান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প প্রবণ দেশ হিসেবে স্বীকৃত। টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার ফলে দেশটিতে প্রায়ই মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। তবে তেহরানের কাছে মোশা ফল্টের এই নতুন সক্রিয়তা সরকারকে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছে। পরদিস এলাকার বাসিন্দারা বর্তমানে আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন এবং অনেক জায়গায় জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন রাখা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামোগত মান উন্নয়নই এখন তেহরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
