চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝু শহরের উপকণ্ঠে সবুজ পাহাড়ের সারিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন চা চাষিরা। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পাহাড়ের ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠা চা গুল্মগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে চতুর্থ প্রজন্মের চা চাষি গে জিয়াওপেং খুব সাবধানে একটি ছোট কচি পাতা পরীক্ষা করছেন। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর নিখুঁত চাপে ডাল থেকে পাতাটি আলাদা করে তিনি নিজের ঝুড়িতে রাখছেন। এই পাতাগুলোই পৃথিবীর অন্যতম দামি এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘লংজিং’ বা ‘ড্রাগন ওয়েল’ গ্রিন টি। প্রতি বছর বসন্তের এই সময়টির জন্য জিয়াওপেংয়ের মতো শত শত কৃষক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
লংজিং চায়ের খ্যাতি কয়েক শতাব্দীর পুরোনো। আঠারো শতকে কিং রাজবংশের সম্রাট চিয়ানলং হাংঝু ভ্রমণের সময় এই চায়ের স্বাদ গ্রহণ করে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি আঠারোটি চা গাছকে ‘রাজকীয় মর্যাদা’ দান করেন। সেই থেকে এই চায়ের উৎপাদন ও স্বাদ চীনের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে হাংঝুর পশ্চিম হ্রদ বা ওয়েস্ট লেকের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে উৎপাদিত লংজিং চায়ের চাহিদা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। তবে বাজারে নকল চায়ের ভিড় এবং মেশিনের সাহায্যে দ্রুত চা তৈরির প্রবণতা বাড়ায় আসল ও ঐতিহ্যবাহী উপায়ে হাতে তৈরি লংজিং চায়ের কদর এখন আরও বেশি।
এই চায়ের গুনাগুণ নির্ভর করে মূলত তা সংগ্রহের সময়ের ওপর। জিয়াওপেং জানান যে লংজিং চা সংগ্রহের নির্দিষ্ট কিছু সময় রয়েছে যা চীনের প্রাচীন কৃষি ক্যালেন্ডারের সাথে যুক্ত। বসন্তের শুরুতে অর্থাৎ এপ্রিলের ৪ বা ৫ তারিখের আগে সংগৃহীত পাতাকে বলা হয় ‘মিংলিয়ান’। এই সময়ের পাতাগুলো অত্যন্ত কোমল এবং এতে মিষ্টি বাদামের সুবাস পাওয়া যায়। এই কচি পাতার দাম এতটাই বেশি যে মাত্র ৫০০ গ্রাম উন্নত মানের মিংলিয়ান চায়ের দাম বর্তমানে ৩০ হাজার ইউয়ান বা প্রায় ৪ হাজার ৪০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। গত এক প্রজন্মে শ্রমের মূল্য বৃদ্ধি এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতি এই আকাশছোঁয়া দামের মূল কারণ।
চায়ের পাতা সংগ্রহের পর শুরু হয় এর সবচেয়ে কঠিন পর্যায়—প্যান ফায়ারিং বা কড়াইতে সেঁক দেওয়া। বিশাল আকৃতির কড়াইগুলোকে ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত করা হয়। এরপর দক্ষ কারিগররা কোনো গ্লাভস ছাড়াই খালি হাতে পাতাগুলোকে নির্দিষ্ট ছন্দে নাড়াচাড়া করেন। জিয়াওপেংয়ের বাবা গে ঝেংহুয়া কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় এই কাজটি নিখুঁতভাবে করে চলেছেন। উত্তপ্ত লোহার ওপর হাতের তালু ঘষার মাধ্যমে পাতার আর্দ্রতা দূর করা হয় এবং সেগুলোকে চ্যাপ্টা আকার দেওয়া হয়। এটি কেবল একটি পদ্ধতি নয়, বরং এটি একটি শিল্প যা লংজিং চায়ের বিশেষ স্বাদ ও ঘ্রাণ নিশ্চিত করে।
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী ফসলের ওপর কালো মেঘের ছায়া ফেলছে। অসময়ে বৃষ্টি বা তাপমাত্রার তারতম্য চায়ের স্বাদে তিতা ভাব নিয়ে আসতে পারে। এছাড়া বর্তমানে অনেক বড় কোম্পানি হাতের বদলে মেশিনের ব্যবহার শুরু করেছে, যা শ্রমসাধ্য এই কাজকে সহজ করলেও আসল লংজিং চায়ের সেই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে। যারা সত্যিকারের লংজিং চায়ের স্বাদ পেতে চান, তাদের জন্য হাংঝুর এই চা গ্রামগুলোতে সশরীরে যাওয়া এখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। কারণ কেবল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগৃহীত চা-ই সেই রাজকীয় ঐতিহ্যের গ্যারান্টি দিতে পারে।
