১৯১৭ সালের ১৩ মে পর্তুগালের ফাতিমা নামক একটি অজপাড়াগাঁয় তিন মেষপালক শিশু দাবি করে যে তারা এক অলৌকিক জ্যোর্তিময় মানবীকে দেখেছে। লুসিয়া ডস সান্তোস এবং তার দুই কাজিন ফ্রান্সিসকো ও জাসিন্টার এই দাবি প্রথম দিকে কেউ বিশ্বাস না করলেও পরবর্তী মাসগুলোতে এটি এমন এক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনে রূপ নেয় যা বিশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এই শিশুদের দেওয়া তিনটি গোপন ভবিষ্যৎবাণী বা সিক্রেট অফ ফাতিমা নিয়ে কয়েক দশক ধরে জল্পনা চলেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় ভবিষ্যৎবাণীটি ছিল সরাসরি রাশিয়ার সমাজতন্ত্র এবং কমিউনিজম বিরোধী। সেখানে বলা হয়েছিল যদি রাশিয়াকে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ না করা হয় তবে দেশটি তার ত্রুটিপূর্ণ মতাদর্শ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে যার ফলে অনেক জাতি ধ্বংস হবে। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের ঠিক আগেই এই ভবিষ্যৎবাণী পর্তুগালের ক্যাথলিকদের মধ্যে এক বিশাল চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল।
ফাতিমার এই ঘটনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ১৯১৭ সালের ১৩ অক্টোবর যাকে মিরাকল অফ দ্য সান বা সূর্যের অলৌকিক ঘটনা বলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে সেদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ফাতিমার মাঠে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ করেই মেঘাচ্ছন্ন আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায় এবং সূর্যটি আগুনের চাকার মতো দ্রুত ঘুরতে শুরু করে। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ দাবি করেন যে সূর্যটি আকাশ থেকে নিচে নেমে আসছে এবং চারপাশে বিভিন্ন রঙের ছটা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিবিসির আর্কাইভ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৯২ সালে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফ্রান্সিসকো ফেরেরা রোসা জানিয়েছিলেন যে তিনি আকাশ থেকে ফুলের বৃষ্টির মতো বরফ পড়তে দেখেছিলেন। সেই সময় পর্তুগালের প্রধান বিরোধী পত্রিকা ও সেকুলো পর্যন্ত এই ঘটনাকে ভয়াবহ কিন্তু সত্য বলে শিরোনাম করেছিল। আধুনিক বিজ্ঞানে একে গণ হ্যালুসিনেশন বা কোনো মেটিওরোলজিক্যাল ঘটনা বলা হলেও বিশ্বাসীদের কাছে এটি ছিল রাশিয়ার পতনের এক আধ্যাত্মিক সংকেত।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় ফাতিমা কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান থাকেনি বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বের কমিউনিস্ট বিরোধী আদর্শের একটি শক্তিশালী স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল। পর্তুগালের একনায়ক আন্তোনিও ডি অলিভেরা সালাজারের শাসনামলে ফাতিমাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়। সেই সময় ইউরোপ এবং আমেরিকায় বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে ভ্যাটিকান যদি ফাতিমার নির্দেশ অনুযায়ী রাশিয়াকে উৎসর্গ করে তবেই কমিউনিজমের পতন ঘটবে। থিওলজিয়ান মাইকেল ওয়ালশ ১৯৯২ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে ফাতিমার বার্তাটি ১৯২০-এর দশকের পর থেকেই মূলত একটি রাজনৈতিক রূপ নেয়। এটি ক্যাথলিক চার্চের ভেতরেও এক ধরনের বিভাজন তৈরি করেছিল কারণ অনেকে মনে করতেন ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরোধী শক্তির কাছে ফাতিমা ছিল আশার আলো।
ফাতিমার এই গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় যখন পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া পোপ জন পল দ্বিতীয় এর ওপর ১৯৮১ সালে আততায়ী হামলা হয়। কাকতালীয়ভাবে সেই হামলার দিনটি ছিল ১৩ মে যা ফাতিমার প্রথম আবির্ভারের বার্ষিকীর সাথে মিলে যায়। পোপ বিশ্বাস করতেন যে ফাতিমার কুমারী মেরীই তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। ১৯৮১ সালের সেই হামলার পর পোপ ফাতিমার রহস্যময় তৃতীয় গোপন বার্তাটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন এবং রাশিয়ার পতনের জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেন। অনেকেরই ধারণা ছিল পোপকে হত্যার প্রচেষ্টার পেছনে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি জড়িত ছিল কারণ পোপ ছিলেন সমাজতন্ত্রের কট্টর বিরোধী। ২০০৫ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিকথায় পোপ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে অন্য কেউ এই হামলার মূল পরিকল্পনা করেছিল যা পরোক্ষভাবে মস্কোর দিকেই ইঙ্গিত করে।
১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতন ঘটে তখন বিশ্বজুড়ে ফাতিমার অনুসারীরা দাবি করেন যে শিশুদের করা সেই ভবিষ্যৎবাণী শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। তাদের মতে ১৯১৭ সালে শুরু হওয়া সেই ঐশ্বরিক সংকেত দীর্ঘ সাত দশক পর রাশিয়ার কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে। ভ্যাটিকান দীর্ঘ সময় ধরে তৃতীয় সিক্রেটটি গোপন রেখেছিল যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচলিত ছিল। অনেকে মনে করতেন সেখানে হয়তো পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বলা আছে। কিন্তু ২০০০ সালে যখন এটি প্রকাশ করা হয় তখন দেখা যায় সেখানে মূলত পোপের ওপর হামলার এবং চার্চের ওপর নির্যাতনের দৃশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। এটি ফাতিমার রাজনৈতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয় কারণ এটি স্নায়ুযুদ্ধের সমীকরণে একটি অতিপ্রাকৃত মাত্রা যোগ করেছিল।
বর্তমান সময়ে ফাতিমা কেবল পর্তুগালের একটি গ্রাম নয় বরং এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর লাখ লাখ পুণ্যার্থী এখনও ফাতিমার মাঠে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করেন। তাদের বিশ্বাস মানুষের প্রার্থনা এবং ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই রাশিয়ার মতো পরাশক্তির পতন সম্ভব হয়েছে। যদিও নাস্তিক বা যুক্তিবাদীরা একে কেবলই কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দেন কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধের দিনগুলোতে ফাতিমার বার্তা যে পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনে কমিউনিজম বিরোধী চেতনাকে তীব্র করে তুলেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফাতিমার অলৌকিক ঘটনা প্রমাণ করে যে অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ কীভাবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে এবং ইতিহাসের বড় বড় বাঁক বদলে প্রভাব বিস্তার করে।
