কয়েক বছর আগে টিম বিসলি যখন তার বাড়ির সদর দরজা খুলেছিলেন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে একটি ছোট প্যাকেট তার পুরো জীবনদর্শন বদলে দেবে। মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থা সেম্পেরিসে কর্মরত বিসলি সে সময় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে হ্যাকারদের সঙ্গে মুক্তিপণ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। প্যাকেটটি খোলার পর তিনি যা দেখলেন তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। ভেতরে ছিল একটি চিরকুট যেখানে সরাসরি তাকে এবং তার পরিবারকে শারীরিক হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বিসলি বুঝতে পারলেন যে ডিজিটাল জগতের অন্ধকার এখন আর শুধু কম্পিউটার স্ক্রিনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা সরাসরি তার ব্যক্তিগত জীবনের দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বিশ্বজুড়ে সাইবার অপরাধের এক নতুন এবং ভয়াবহ প্রবণতার অংশ যা ২০২৬ সালে এসে চরম উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআই-এর সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সাল ছিল সাইবার অপরাধের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর রেকর্ড সংখ্যক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫৯৭টি সাইবার হামলার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংখ্যা ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ। ২০২৫ সালে মার্কিন কোম্পানি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলার কারণে প্রায় ২০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে যা ২০২৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের বাইরে সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো হ্যাকারদের কর্মপদ্ধতি পরিবর্তন। অপরাধীরা এখন আর শুধু সার্ভার লক করে বা তথ্য চুরি করে শান্ত থাকছে না তারা এখন সরাসরি কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে হানা দিচ্ছে।
সেম্পেরিস নামক নিরাপত্তা সংস্থার এক পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে হওয়া প্রায় ৪০ শতাংশ র্যানসামওয়্যার বা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় হ্যাকাররা সরাসরি শারীরিক হামলার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি যা প্রায় ৪৬ শতাংশ। হ্যাকাররা এখন ডার্ক ওয়েবে থাকা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য যেমন বাড়ির ঠিকানা, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর বা সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর এবং ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এক সময়ের কেবল আর্থিক ক্ষতি এখন প্রাণের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা বলছেন যে এই ধরনের হুমকি কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি মার্কিন হাসপাতালের মুক্তিপণ আলোচনার উদাহরণ টেনে টেনিয়াম নামক নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা জ্যাক ওয়ারেন জানান যে কীভাবে হ্যাকাররা নার্স এবং চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত ফোনে কল করে ভয় দেখাচ্ছিল। হ্যাকাররা নার্সদের নাম ধরে ডেকে বলত যে তারা জানে ওই নার্সরা কোথায় থাকেন এবং তাদের সন্তানেরা কোন স্কুলে যায়। এমনকি তারা নার্সদের বাড়ির ঠিকানা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিখুঁত বিবরণ দিত যাতে কর্মীরা মনে করেন যে তাদের ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হচ্ছে। এই স্তরের ভীতি প্রদর্শন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কাজকে ব্যাহত করে না বরং এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। যখন একজন সেবাকর্মী নিজের বাড়িতেও নিরাপদ বোধ করেন না তখন পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শারীরিক হুমকির বিষয়টি শুধু চিরকুট বা ফোন কলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হ্যাকাররা এখন ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে হ্যাকাররা কারখানার রোবট বা কনভেয়ার বেল্ট নিয়ন্ত্রণ করে তা ইচ্ছামতো অন বা অফ করে তাদের শক্তির জানান দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায় যে মুক্তিপণ না দিলে তারা কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের প্রাণহানি ঘটাতে পারে। এই ধরনের স্যাবোটাজ বা নাশকতা সাইবার নিরাপত্তাকে এখন সরাসরি ভৌত নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। শিল্পকারখানাগুলোতে ব্যবহৃত ইন্টারনেট অফ থিংস বা আইওটি ডিভাইসগুলোর দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা এখন মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই হুমকি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। এফবিআই এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় চলা অনেক হ্যাকার গোষ্ঠী এই ধরনের কৌশলী হুমকি দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ শারীরিক হুমকি আসছে মূলত এমন সব গ্রুপ থেকে যারা কেবল আর্থিক লাভের জন্য কাজ করে। মজার বিষয় হলো এই অপরাধীদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তাদের অধিকাংশের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অল্প বয়সী এই হ্যাকাররা সাধারণত নিজেদের হাত নোংরা করতে চায় না। তারা ডার্ক ওয়েব বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে স্থানীয় অপরাধীদের ভাড়া করে যাতে তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তির বাড়িতে হুমকি দিয়ে আসে বা তাকে অনুসরণ করে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার প্রসারের সঙ্গে এই শারীরিক সহিংসতা এক অন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। গত বছরের মে মাসে ফ্রান্সের প্যারিস থেকে একজন ক্রিপ্টো কোটিপতির বাবাকে অপহরণের ঘটনা এর একটি বড় প্রমাণ। হ্যাকাররা যখন দেখে যে ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে তখন তারা অপহরণ বা সরাসরি হামলার মতো সনাতন অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। ডিজিটাল জগত এবং বাস্তব জগতের এই বিপজ্জনক সংমিশ্রণ ২০২৬ সালের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসলি যেমনটা বলেছেন আগে এটি ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল কিন্তু এখন এটি আমাদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা এখন আর শুধু সফটওয়্যার আপডেট বা পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি এখন ব্যক্তিগত জীবনের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
