ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় চীনকে খাদ্য ও সার মজুত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস। মঙ্গলবার বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি এই মন্তব্য করেন। বিবিসির ‘ওয়ার্ল্ড বিজনেস রিপোর্ট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যালপাস বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্য ও সারের মজুত এখন চীনের হাতে রয়েছে এবং এই সংকটকালে তাদের উচিত নতুন করে মজুত না বাড়িয়ে তা বাজারে উন্মুক্ত করা।
ডেভিড ম্যালপাস, যিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আন্তর্জাতিক বিষয়ক ট্রেজারি আন্ডার সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার ও খাদ্যশস্যের শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বসন্তকালীন বপনের মৌসুম সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সারের জন্য হাহাকার করছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন যদি তাদের মজুত ধরে রাখে, তবে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। গত মার্চ মাস থেকে চীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে বেশ কয়েক ধরনের সার রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, যা মূলত ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া কড়াকড়িরই ধারাবাহিকতা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত সারের প্রায় ২৫ শতাংশই চীন উৎপাদন করেছে এবং তাদের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ম্যালপাস মনে করেন, চীনের মতো একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যখন নিজেকে এখনো ‘উন্নয়নশীল রাষ্ট্র’ হিসেবে দাবি করে, তখন তা আর গ্রহণযোগ্য থাকে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বিশ্বব্যাংকে চীনের এই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তকমা ব্যবহার করে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার প্রচেষ্টাকে তিনি ‘ভণ্ডামি’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীনের এখন বৈশ্বিক দায়িত্ব পালন করা উচিত।
তবে চীনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বিবিসিকে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, চীন বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও সারের বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার এই বিশৃঙ্খলার জন্য চীনকে দায়ী করা ঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে চীনের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদাকে তিনি একটি ‘বৈধ অধিকার’ হিসেবে সমর্থন করেন এবং ম্যালপাসের মন্তব্যকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে উল্লেখ করেন।
ইরান যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে ম্যালপাস বলেন, সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধবিরতিকে ‘লাইফ সাপোর্ট’-এ রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগের। তিনি মনে করেন, পারমাণবিক ক্ষমতাধর একটি রাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রাখবে, তা বিশ্ব মেনে নিতে পারে না। ম্যালপাস আশাবাদী যে চীন এই অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে। কারণ, মুক্ত নৌ-চলাচল চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থেই প্রয়োজন। শিপিং লাইন এবং কন্টেইনার ব্যবসার বড় অংশ চীনের দখলে থাকায় হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা তাদের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নিয়েও কথা বলেছেন ম্যালপাস। এপ্রিলের মুদ্রাস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাজারে অনেক পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে শক্তিশালী কর্মসংস্থানের তথ্য মার্কিন অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। সব মিলিয়ে বেইজিং সম্মেলন থেকে বিশ্ববাসী কী পায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক মহল।
