কাঠমিস্ত্রির কাজ বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ধুলোবালি মাখা একটি ঘর এবং করাতের কর্কশ শব্দ। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আসবাবপত্র নির্মাতা এবং প্রশিক্ষক রায়ান স্যান্ডার্স বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন যে বর্তমানে এমন সব কর্মশালা তৈরি হচ্ছে যা প্রায় ধুলোবালি মুক্ত। গত কয়েক দশকে কাঠশিল্পে প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এটিই। মানুষের ফুসফুসের সুরক্ষা এবং কর্মপরিবেশের মানোন্নয়নে উচ্চ-চাপের এক্সট্র্যাক্টর এবং উন্নত মানের ফিল্টার এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে প্রকৌশলী ক্রিস ডি জং ব্লাস্টগেট ডটকম নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন যারা এমন এক ডিভাইস তৈরি করেছে যা কেবল তখনই ধুলো নিষ্কাশন করে যখন তার প্রয়োজন হয়। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় যেমন হচ্ছে তেমনি যন্ত্রপাতির আয়ুও বাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের একটি কিচেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তাদের বিনিয়োগ উঠে এসেছে।
প্রযুক্তি শুধু কর্মপরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করেনি বরং একে অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলেছে। বিশেষ করে টেবিল স বা কাঠ কাটার করাতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপ্লব ঘটেছে। মার্কিন কোম্পানি স-স্টপ এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছে যা মানুষের ত্বক স্পর্শ করার মাত্র পাঁচ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে করাতের ঘূর্ণায়মান ব্লেডকে থামিয়ে দেয়। ব্লেডটিতে একটি ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল থাকে যা ধাতুর সঙ্গে চামড়ার সংস্পর্শ হওয়া মাত্রই সংকেত পাঠায় এবং ব্লেডটি মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের নিচে চলে যায়। রায়ান স্যান্ডার্স বলেন এটি এমন এক প্রযুক্তি যা আপনাকে বড় কোনো প্লাস্টিক সার্জারি থেকে বাঁচিয়ে শুধু একটি ব্যান্ডেজ ব্যবহারের পর্যায়ে নিয়ে আসে। অন্যদিকে জার্মান কোম্পানি আলটেনডর্ফ ২০২২ সাল থেকে হ্যান্ড গার্ড প্রযুক্তিতে ক্যামেরা এবং এআই ব্যবহার করছে যা হাত করাতের খুব কাছাকাছি আসার আগেই বিপদ শনাক্ত করতে পারে।
উনিশ শতকের একজন কাঠমিস্ত্রিকে যদি আজকের আধুনিক কর্মশালায় নিয়ে আসা হয় তবে তিনি অবাক হয়ে যাবেন। যদিও হাতুড়ি বা বাটালির মতো মৌলিক যন্ত্রপাতির মূলনীতি একই রয়ে গেছে তবে লেজার কাটার বা থ্রিডি প্রিন্টারের মতো ডিজিটাল যন্ত্রগুলো তার কাছে অচেনা মনে হবে। বর্তমানে অনেক কাঠমিস্ত্রি নিজেদের পছন্দমতো সরঞ্জাম তৈরির জন্য থ্রিডি প্রিন্টার ব্যবহার করছেন। এছাড়া সিএনসি রাউটার নামের এক ধরনের কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত কাটিং মেশিন এখন কাঠশিল্পে ব্যাপক জনপ্রিয়। এই মেশিনগুলো কয়েক দশক ধরে থাকলেও বর্তমানে এর সফটওয়্যার ব্যবহার করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে টুল পরিবর্তন করার ক্ষমতা এই যন্ত্রগুলোকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে। আমেরিকান কোম্পানি শেপার এখন হাতে ধরা যায় এমন সিএনসি রাউটার তৈরি করছে যা ডিজিটাল স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে নিখুঁত নকশা তৈরি করতে সক্ষম।
কাঠশিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রবেশ ঘটেছে মূলত ডিজাইন এবং কাঁচামাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। স্থপতি এবং নির্মাতারা এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে দ্রুত নতুন নতুন নকশা তৈরি করছেন। লন্ডনের প্রপমেকার মার্ক ভাসিলকভ চলচ্চিত্রের সেট তৈরিতে এআই ইমেজ জেনারেটর ব্যবহার করেন যা তাকে দ্রুত বিকল্প নকশা বেছে নিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অটোমেটেড আর্কিটেকচার (AUAR) একটি রোবটিক মাইক্রোফ্যাক্টরি তৈরি করেছে যা একটি শিপিং কন্টেইনারের ভেতরে অনায়াসেই বসানো যায়। এই রোবটটি মাত্র এক দিনের মধ্যে একটি বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাঠের প্যানেল তৈরি করে ফেলতে পারে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী মলি ক্লেপুল মনে করেন এই অটোমেশন কাঠমিস্ত্রিদের চাকরি কেড়ে নেবে না বরং তাদের কাজে গতি আনবে।
তবে প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের মধ্যেও কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। রায়ান স্যান্ডার্স তার ছাত্রদের পরামর্শ দেন যেন তারা অতিরিক্তভাবে এআই-এর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়েন। কোনো উপাদানের টেকসই ক্ষমতা বা টুলের ব্যবহার সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। অনেক পেশাদার শিল্পী এখনো ডিজিটাল রিডআউটের চেয়ে সরাসরি হাতের স্পর্শে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাদের মতে ডিজিটাল পর্দার দিকে তাকিয়ে কাজ করতে গেলে কাঠের সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক সম্পর্ক থাকে তা কিছুটা হলেও হারিয়ে যায়। তবুও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে আধুনিক প্রযুক্তি কাঠশিল্পকে শুধু সহজই করেনি বরং একে একটি স্মার্ট এবং স্বাস্থ্যসম্মত পেশা হিসেবে নতুন রূপ দিয়েছে।
