জার্মান ইলেকট্রনিক মিউজিক ব্যান্ড ক্রাফটওয়ার্কের ‘রেডিওঅ্যাক্টিভিটি’ ট্র্যাকটির বয়স চলতি মাসে ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই একক গানটি কেবল একটি সুর ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক সংগীতের ইতিহাসের এক বাঁক পরিবর্তনকারী মুহূর্ত। শুরুর সেই কয়েক সেকেন্ডের কম্পমান গেইগার কাউন্টারের শব্দ, ক্রমশ বাড়তে থাকা সিন্থেসাইজার এবং মোর্স কোডের সংকেত—সব মিলিয়ে এটি এমন এক ধ্বনি যা গত পাঁচ দশকে বারবার নিজের রূপ বদলেছে। একটি বৈজ্ঞানিক গীত থেকে শুরু করে ক্লাবের ড্যান্স ফ্লোর কাঁপানো গান এবং পরিশেষে একটি শক্তিশালী পরমাণুবিরোধী স্লোগান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এই সৃষ্টি।
১৯৭৫ সালে যখন ক্রাফটওয়ার্ক তাদের পঞ্চম স্টুডিও অ্যালবাম ‘রেডিও-অ্যাক্টিভিটি’ রেকর্ড করছিল, তখন তারা ছিল তাদের ক্যারিয়ারের এক উত্তাল সময়ে। ব্যান্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাল্ফ হুটার এবং ফ্লোরিয়ান স্নাইডার ডুসেলডর্ফের বিখ্যাত ‘ক্লিং ক্লাং’ স্টুডিওতে এই কাজটি সম্পন্ন করেন। এই অ্যালবামটি ছিল তাদের জন্য একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র। অ্যালবামের নামটির মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা। ইংরেজি ‘Radio-Activity’ শব্দটি দিয়ে তারা একই সাথে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে তথ্যের প্রবাহ এবং তেজস্ক্রিয়তা—উভয়কেই বুঝিয়েছিলেন। শীতল যুদ্ধ চলাকালীন সেই সময়ে একদিকে যেমন তথ্যের অবাধ প্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্ক মানুষের মনে জাঁকিয়ে বসেছিল।
ক্রাফটওয়ার্কের এই কাজের আগে তাদের সংগীত শৈলীতে বাঁশি বা ভায়োলিনের মতো লোকজ বা জ্যাজ ঘরানার বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব ছিল। কিন্তু ‘রেডিওঅ্যাক্টিভিটি’ ট্র্যাকে তারা পুরোপুরি ইলেকট্রনিক জগতে প্রবেশ করে। মিনিমুগ (Minimoog) সিন্থেসাইজার এবং ভাকো অর্কেস্ট্রন (Vako Orchestron)-এর মতো যন্ত্রের ব্যবহার গানটিকে একটি পরাবাস্তব আবহ দান করে। রাল্ফ হুটার একবার বলেছিলেন যে, এটি ছিল এক ধরনের ‘সায়েন্স ফিকশন’ অ্যালবাম যেখানে সৌন্দর্য আর আতঙ্ক পাশাপাশি বসবাস করত। তাদের এই ‘স্পিচ সিম্ফনি’ বা কথা বলার ঢংয়ে গান গাওয়ার পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে তরুণ শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছিল, যা পরবর্তীতে টেকনো এবং সিন্থ-পপ ঘরানার জন্ম দেয়।
তবে ‘রেডিওঅ্যাক্টিভিটি’ গানটির প্রকৃত বিবর্তন ঘটে এর রাজনৈতিক অবস্থানে। প্রথম দিকে গানটির লিরিক্স ছিল অনেকটা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের মতো। ‘রেডিওঅ্যাক্টিভিটি ইজ ইন দ্য এয়ার ফর ইউ অ্যান্ড মি’—এই লাইনের মাধ্যমে তারা পরিবেশের তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতির কথা বলতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল বিপর্যয় এবং পরবর্তীতে ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর ব্যান্ডটি এই গানের কথা বদলে দেয়। ১৯৯১ সালে তাদের ‘দ্য মিক্স’ অ্যালবামে তারা সরাসরি ‘স্টপ রেডিওঅ্যাক্টিভিটি’ স্লোগানটি অন্তর্ভুক্ত করে। গানের মধ্যে চেরনোবিল, হ্যারিসবার্গ, সেলাফিল্ড এবং হিরোশিমার মতো পারমাণবিক বিপর্যয়ের স্থানগুলোর নাম যোগ করা হয়। এর মাধ্যমে গানটি একটি বিশুদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
গত ৫০ বছরে প্রযুক্তি এবং বিশ্ব রাজনীতি অনেক বদলে গেছে, কিন্তু ‘রেডিওঅ্যাক্টিভিটি’ ট্র্যাকে ক্রাফটওয়ার্ক যে সতর্কবার্তা দিয়েছিল, তার আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। আজকের পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেখানে ক্রাফটওয়ার্কের এই দূরদর্শী সৃষ্টি আজও প্রাসঙ্গিক। ইলেকট্রনিক সংগীতের পথিকৃৎ হিসেবে তারা কেবল নতুন যন্ত্রের পরিচয় করিয়ে দেননি, বরং সংগীতকে কীভাবে সামাজিক সচেতনতার কাজে লাগানো যায়, তার এক আদর্শ উদাহরণ তৈরি করেছেন। ৫০ বছর আগের সেই মোর্স কোডের সংকেত আজও আমাদের কানে অনুরণিত হয়, যেন এটি আগামীর কোনো সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই সুরটি এখন কেবল একটি গান নয়, বরং একটি বিশ্বজনীন ভাষ্য।
