মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আধুনিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলে রয়েছে তাদের খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের বিপুল ভাণ্ডার। গত তিন দশক ধরে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তাদের ভূ-গর্ভস্থ সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত এই স্থিতিশীলতাকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে গত ১৮ মার্চের ঘটনাটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য কেবল একটি সামরিক আঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল তাদের কয়েক দশকের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূলে এক কুঠারাঘাত। সেদিন কাতারের রাস লাফান গ্যাস কমপ্লেক্সে ইরানের একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যা বিশ্বজুড়ে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৭ শতাংশ সরবরাহ এক নিমেষেই বন্ধ করে দেয়। এই হামলার ফলে কাতার এনার্জি বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং বিধ্বস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কাতার যখন উচ্চ ঋণ এবং দুর্বল রাজস্ব আয়ের চাপে জর্জরিত ছিল, তখন দেশটি তাদের অফশোর গ্যাস রিজার্ভকে এলএনজিতে রূপান্তর করার একটি বড় ঝুঁকি নিয়েছিল। রাজধানী দোহা থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে গড়ে তোলা হয়েছিল রাস লাফান শিল্প নগরী, যা সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই একক সিদ্ধান্তই কাতারকে বিশ্ব মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিল। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই সাফল্যের গল্পকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল কাবি গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন যে, এই হামলার ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অন্তত ১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে গেছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির সিনিয়র রিসার্চ স্কলার কারেন ইয়ং মনে করেন, এই হামলা কেবল জ্বালানি বাজারের জন্য একটি ধাক্কা ছিল না, বরং এটি উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করেছে।
ইরানের এই হামলা ছিল মূলত প্রতিশোধমূলক, কারণ এর আগে ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে বোমা হামলা চালিয়েছিল। ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিকভাবে ইরানের সাউথ পার্স এবং কাতারের নর্থ ডোম ফিল্ড একই খনির অংশ এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডার। এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার সরাসরি যুদ্ধ এখন কেবল সীমান্তের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৮০টিরও বেশি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একটি স্বাধীন জরিপ সংস্থার মতে, চলমান এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত জ্বালানি খাতের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলারে।
এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ব্যাপকভাবে কাটছাঁট করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, চলতি বছর এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা এর আগে ২০২৬ সালের জন্য ৪ শতাংশ ধরা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, এই যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোর অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থায়ী ‘ক্ষত’ বা স্কারিং সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে কাতার এবং কুয়েতের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় ধরনের সংকোচনের মুখে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন এই অঞ্চলকে আর নিরাপদ হিসেবে দেখছেন না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী মূলধন বিনিয়োগ বা এফডিআই প্রবাহে বড় ধরনের স্থবিরতা আসতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল জোট ওপেকের সঙ্গে দূরত্ব এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক বছর ধরে তাদের অর্থনীতিকে খনিজ তেল ও গ্যাসের ওপর থেকে সরিয়ে পর্যটন ও প্রযুক্তিনির্ভর করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রাস লাফানের মতো স্থাপনা পুনর্নির্মাণ কেবল অর্থের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এশিয়ার বাজারগুলোতে, বিশেষ করে চীন ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোতে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এটি কেবল আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং একটি বিশ্বজনীন অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ফেরাতে যদি দ্রুত কোনো কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই ‘স্কাারিং’ বা ক্ষত চিহ্ন আগামী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বইতে হবে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে। জ্বালানি সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে যে সমৃদ্ধির সৌধ নির্মিত হয়েছিল, যুদ্ধের উত্তাপ আজ সেই প্রাচীরেই ফাটল ধরিয়েছে।
