বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব ও নির্দেশক আতাউর রহমান চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে তার প্রিয় জননী বা মায়ের কবরেই সমাহিত করা হয়। বাদ জোহর জানাজা এবং বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে কবরে নামানো হয়। এর আগে সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কীর্তিমান পুরুষ। তার প্রয়াণে দেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
আতাউর রহমানের শেষ বিদায়ে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের বহু মানুষ অংশ নেন। মঙ্গলবার দুপুরে মগবাজারের ইস্পাহানি সেঞ্চুরি আর্কেডে তার নিজ বাসভবনের সামনে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন তার ছোট ভাই আবু নোমান মামুদুর। এই নামাজে অংশ নেন তার দীর্ঘদিনের পথচলার সঙ্গী মামুনুর রশীদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, অভিনেতা জাহিদ হাসান, গাজী রাকায়েতসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অসংখ্য গুণী শিল্পী ও কলাকুশলী। সবার চেহারায় ছিল প্রিয় মানুষকে হারানোর গভীর শোকের ছাপ। জানাজা শেষে তার মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হয়।
শহীদ মিনারে আতাউর রহমানের মরদেহে সর্বস্তরের মানুষ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মামুনুর রশীদ বলেন যে আতাউর রহমানের চলে যাওয়া মানে একটি যুগের অবসান। তিনি কেবল একজন নির্দেশকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন মঞ্চের একজন নিরলস কর্মী ও পথপ্রদর্শক। শহীদ মিনারের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে নেওয়া হয় এবং সেখানে মাটির গহ্বরে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।
আতাউর রহমানের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘এখন দুঃসময়’ এবং ‘অপেক্ষমাণ’-এর মতো কালজয়ী নাটকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন। নাগরিকের বাইরেও তিনি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘ম্যাকবেথ’ এবং ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’-এর মতো প্রভাবশালী নাটকের সফল নির্দেশক ছিলেন। মঞ্চের বাইরে টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও তিনি দক্ষতার সাথে অভিনয় করেছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের মেন্টর হিসেবে কাজ করেছেন।
মঞ্চ ও সংস্কৃতির প্রতি তার এই আজীবন একাগ্রতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন শিল্পকলার একজন বিদগ্ধ চিন্তক এবং গবেষক। তার লেখা ‘মঞ্চসারথির কাব্যকথা’ ও ‘নাট্যপ্রবন্ধ বিচিত্রা’র মতো বইগুলো নাট্যকর্মীদের জন্য অমূল্য সম্পদ। আতাউর রহমান চলে গেলেও তার নির্দেশিত নাটকগুলো এবং তার সৃজনশীল কাজগুলো যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের কর্মীদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
