আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মঙ্গলবার প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার প্রভাবে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কমেছে। একই সময়ে বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের শক্তি বৃদ্ধি এবং অপরিশোধিত তেলের চড়া দাম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বিনিয়োগকারীরা এখন মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার সংক্রান্ত পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা তাৎক্ষণিক লেনদেনযোগ্য স্বর্ণের দাম ০.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৬৯৮ দশমিক ২২ ডলারে নেমে এসেছে। অথচ দিনের শুরুতে লেনদেনের শুরুতে স্বর্ণের দাম গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেই হিসেবে এক দিনেই দামের এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে দিয়েছে। অন্যদিকে ফিউচার মার্কেটেও স্বর্ণের দাম কমেছে। আগামী জুন মাসে হস্তান্তরের জন্য নির্ধারিত মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারের দাম ০.৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭০৬ দশমিক ১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার আলোচনা নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের বদলে ডলারের দিকে ধাবিত করছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি টেকসই শান্তি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্ফীতি তথ্য বা ইনফ্লেশন ডেটা প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছেন যা স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে তা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও প্রকট করে তুলবে। তেলের উচ্চমূল্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়, যা প্রকারান্তরে সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, সুদের হার দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত সুদের হার বেশি থাকলে স্বর্ণের মতো সম্পদ, যা কোনো নির্দিষ্ট সুদ প্রদান করে না, তার চাহিদা কমে যায়। ফলে ডলার ও বন্ড ইল্ড শক্তিশালী হওয়ায় স্বর্ণের দাম চাপের মুখে পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন কেবল স্বর্ণ নয়, বরং অন্যান্য মুদ্রার মানের দিকেও নজর রাখছেন। ডলারের মান বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার অধিকারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, যা চাহিদাকে আরও কমিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি প্রশমিত না হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা যদি কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে না আনে, তবে স্বর্ণের বাজার আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে এমনই অস্থিতিশীল থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্বর্ণের দামের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করা বিনিয়োগকারীরাও পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় কিছুটা সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন।
