শহরের ব্যস্ত রাস্তার নিচে যেখানে মানুষের পদচারণা আর যানবাহনের কোলাহল চলে, ঠিক সেখানেই নিঃশব্দে গড়ে উঠছে এক ভয়াবহ দানব। লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল রোডের নিচে ভিক্টোরিয়ান যুগের নর্দমায় সম্প্রতি এমনই এক দৈত্যাকার ‘ফ্যাটবার্গ’ বা তেলের পাহাড়ের সন্ধান পেয়েছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। এই স্তূপটির ওজন ১৩০ টনেরও বেশি যা লন্ডনের বিখ্যাত ১১টি ডাবল ডেকার বাসের সমান। চর্বি, রান্নার তেল, ব্যবহৃত টিস্যু এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের এই কঠিন সংমিশ্রণ এখন বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর নর্দমা ব্যবস্থার জন্য প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা এবং পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই আধুনিক বিপদ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর শরণাপন্ন হচ্ছে।
ফ্যাটবার্গ মূলত এক ধরণের জমাট বাঁধা নোংরা বস্তু যা মানুষের ফেলে দেওয়া চর্বি ও তেলের সঙ্গে স্যানিটারি পণ্য এবং কন্ডোমের মতো অপচনশীল বর্জ্য মিশে তৈরি হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় ইংল্যান্ডের নর্দমা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সাউদার্ন ওয়াটারের কর্মকর্তারা একে একটি ‘যাদুকরী মিশ্রণ’ বলে অভিহিত করেছেন কারণ এটি একবার জমে গেলে সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে যায়। এই দানবীয় স্তূপগুলো নর্দমার স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেয় যার ফলে নর্দমার ময়লা পানি উপচে আশপাশের নদীতে মিশে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। ২০১৭ সালে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলের নিচে এমন একটি বিশাল ফ্যাটবার্গ সরাতে কর্মীদের ৯ সপ্তাহ সময় লেগেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেখা গেছে সেই একই স্থানে আবারও ১০০ টনের বেশি ফ্যাটবার্গ নতুন করে গড়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে এই সমস্যাটি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক সিটি প্রতি বছর নর্দমা থেকে তেল সরাতে এবং জট মুক্ত করতে প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ডলার খরচ করে। সেখানে নর্দমা আটকে যাওয়ার ৪০ শতাংশ কারণই হলো চর্বি বা গ্রিজ। শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য নয় বরং মেলবোর্ন, সিডনি এবং ডেট্রয়েটের মতো শহরগুলোর নিচেও এই দানবীয় ফ্যাটবার্গের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় মূল চ্যালেঞ্জ হলো ফ্যাটবার্গটি বিশাল আকার ধারণ করার আগেই তা শনাক্ত করা। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে নর্দমার গভীরে এগুলো তিল তিল করে বড় হয় এবং কোনো বড় বিপর্যয় ঘটার আগে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সংকট নিরসনে বর্তমানে রাডার সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। সাউদার্ন ওয়াটার তাদের নর্দমা ব্যবস্থায় প্রায় ৩৪ হাজার সেন্সর স্থাপন করেছে। এই সেন্সরগুলো ম্যানহোলের ঢাকনার নিচে বসানো থাকে এবং রাডার সিগন্যালের মাধ্যমে নর্দমার পানির উচ্চতা পরিমাপ করে। সংগৃহীত এই তথ্যগুলো একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমে পাঠানো হয়। এই এআই ব্যবস্থাটি আবহাওয়ার তথ্য এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বিশ্লেষণ করে প্রতিদিনের স্বাভাবিক পানির স্তরের একটি ধারণা তৈরি করে। যখনই পানির উচ্চতা সেই স্বাভাবিক সীমার বাইরে চলে যায় তখনই এআই সংকেত পাঠায় যে সেখানে সম্ভবত কোনো ফ্যাটবার্গ জমতে শুরু করেছে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি কর্মীদের বিপজ্জনক ভূগর্ভস্থ পরিবেশে প্রবেশের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। নর্দমার ভেতরে হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো বিষাক্ত গ্যাস থাকে যা মানুষের প্রাণের জন্য হুমকিস্বরূপ। এছাড়া সেখানে বিভিন্ন ধরণের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে। এআই-এর মাধ্যমে আগাম সংকেত পাওয়ায় ফ্যাটবার্গগুলো শক্ত হওয়ার আগেই সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। সাউদার্ন ওয়াটার জানিয়েছে ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসেই তারা এআই ব্যবহার করে প্রায় ৭০০টি বড় জট পরিষ্কার করেছে। ২০২৫ সালে তাদের সেবামূলক এলাকায় ১৫ হাজার ৫০০টি স্পিল বা পানি উপচে পড়ার ঘটনা ঘটলেও তা ২০২৪ সালের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কম যা এই প্রযুক্তির সাফল্যেরই প্রমাণ দেয়।
