ইউরোপের অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত সীমান্ত রুট ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশের নেপথ্যে থাকা এক ভয়ংকর নেটওয়ার্কের প্রধান হোতাকে উন্মোচিত করেছে বিবিসির একটি বিশেষ তদন্তমূলক দল। গত কয়েক বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে ছোট নৌকায় করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চ্যানেল পাড়ি দেওয়ানোর পেছনে যে চক্রটি কাজ করছে, তার শীর্ষ নায়ক ২৮ বছর বয়সী এক ইরাকি কুর্দি। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চোখে ধুলো দিয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি `কার্দো রানিয়া` ছদ্মনামে এই বিশাল পাচার সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছিলেন। তার আসল নাম এবং পরিচয় একটি নিবিড় গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা ছিল, যা ইউরোপীয় পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য তাকে ধরার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে বিবিসির অনুসন্ধানী দল ফ্রান্সের অভিবাসী ক্যাম্প থেকে শুরু করে ইরাকি কুর্দিস্তানের দুর্গম এলাকা পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথ অনুসরণ করে অবশেষে এই পাচারকারী রাজার আসল পরিচয় সামনে এনেছে।
কার্দো রানিয়া ছদ্মনামটি এসেছে ইরাকি কুর্দিস্তানের `রানিয়া` নামক একটি শহর থেকে। ২০২৪ সালে চ্যাথাম হাউসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই অঞ্চলটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবপাচার নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি বা এনসিএ-র ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি ডিরেক্টর ড্যান ক্যানাটেলা-বারক্রফ্ট জানিয়েছেন যে, ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকার মাধ্যমে যে অবৈধ ব্যবসার মডেল গড়ে উঠেছে, তার সিংহভাগই এখন কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে। এই চক্রটি স্থানীয়ভাবে `রানিয়া বয়েজ` নামে পরিচিত। তারা শুধু চ্যানেল পারাপার নয় বরং আফগানিস্তান থেকে শুরু করে তুরস্ক ও ইউরোপ হয়ে ব্রিটেন পর্যন্ত এক নিরবচ্ছিন্ন পাচার রুট গড়ে তুলেছে। বিবিসির রেডিও ৪ পডকাস্ট `ইন্ট্রিগ: টু ক্যাচ এ কিং`-এ এই রোমহর্ষক অনুসন্ধানের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে যে কার্দো রানিয়া তার আসল নাম গোপন রাখলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের চেহারা দেখাতে মোটেও দ্বিধাবোধ করেন না। তিনি টিকটক এবং ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। সেখানে তিনি লন্ডনের বিলাসবহুল জীবনের ছবি এবং আগে সফলভাবে ব্রিটেনে পৌঁছেছেন এমন অভিবাসীদের ভিডিও টেস্টিমোনিয়াল বা সাক্ষ্য ব্যবহার করে নতুন গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করেন। একজন সাবেক পাচারকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কার্দো রানিয়ার নেটওয়ার্ক ইরাক থেকে ব্রিটেন পর্যন্ত একজন অভিবাসীকে পৌঁছে দিতে প্রায় ১৭ হাজার ইউরো বা ১৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড পর্যন্ত চার্জ করে থাকে। যদিও এটি অন্য পাচারকারী চক্রের তুলনায় অনেক বেশি দামি, তবুও অভিবাসীরা তার কাছেই ভিড় করে কারণ তিনি তার রুটকে `ভিআইপি` এবং `নিরাপদ` হিসেবে প্রচার করেন। তবে বাস্তবতা হলো ইংলিশ চ্যানেলের উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া কখনোই নিরাপদ নয় এবং গত কয়েক বছরে এই পথে অসংখ্য মানুষের সলিল সমাধি হয়েছে।
২০২০ সাল থেকে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় অবৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এনসিএ-র তথ্যমতে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ব্রিটেনে আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে যারা বর্তমানে বিভিন্ন হোটেল, হাউজ অব মাল্টিপল অকুপেশন বা এইচএমও এবং পরিত্যক্ত সামরিক ছাউনিতে বসবাস করছেন। চ্যানেলের এই পাচার বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারীদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে আগতদের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই পুরুষ এবং তাদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। কার্দো রানিয়ার মতো পাচারকারীরা মূলত এই তরুণদেরই টার্গেট করে এবং তাদের চোখে ব্রিটেনে একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুনে দেয়। কিন্তু বাস্তবে এই দীর্ঘ যাত্রাটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপে অবৈধ এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
বিবিসির অনুসন্ধানী সাংবাদিক সু মিচেল এবং রব লরি এই তদন্তের খাতিরে দীর্ঘদিন ধরে ছদ্মবেশে কাজ করেছেন। তারা ফ্রান্সে উত্তর উপকূলের অভিবাসী শিবিরে গিয়ে পাচারকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের গোপন যোগাযোগের সূত্রগুলো খুঁজে বের করেছেন। কার্দো রানিয়া তার পরিচয়ের গোপনীয়তা বজায় রেখে যেভাবে এতদিন আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্ট এড়িয়ে চলেছেন তা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও অবাক করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং পাচারকারীর আসল নাম না জানাই ছিল তার টিকে থাকার প্রধান চাবিকাঠি। এখন তার আসল পরিচয় এবং কুর্দিস্তানে তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এই বিশেষ প্রতিবেদনটি আরও স্পষ্ট করে দেয় যে কীভাবে একটি ছোট শহর থেকে গড়ে ওঠা অপরাধী চক্র পুরো একটি মহাদেশের অভিবাসন নীতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। রানিয়া বয়েজদের নেটওয়ার্ক এখন এতটাই শক্তিশালী যে তারা সরকারি কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে বড় বড় নৌযান এবং লাইফ জ্যাকেটের চালান নিয়মিতভাবে ফরাসি উপকূলে পৌঁছে দিচ্ছে। যদিও ব্রিটেন সরকার এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে তবুও এই পাচার বাণিজ্যের লাভজনক দিকটি তরুণদের এই অপরাধের দিকে আকৃষ্ট করছে। কার্দো রানিয়াকে উন্মোচিত করা এই দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রথম ধাপ মাত্র। যতক্ষণ পর্যন্ত পাচারের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক শেকড় উপড়ানো না যাবে ততক্ষণ ইংলিশ চ্যানেলে ছোট নৌকার মিছিল থামানো কঠিন হবে।
