উত্তর আটলান্টিকে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে নতুন তিনটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের লক্ষ্যে ডেনমার্কের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের গোপন আলোচনা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে আয়োজিত এক গণতন্ত্র সম্মেলনে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা বেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে এবং উভয় পক্ষই একটি সম্মানজনক সমঝোতার দিকে যাচ্ছে। যদিও আলোচনার বিস্তারিত তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতেই পেন্টাগন এই উদ্যোগ নিয়েছে। রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী পেন্টাগন দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে এই ঘাঁটিগুলো স্থাপন করতে চায় যেখানে আগে থেকেই বিমানবন্দর বা বন্দরের মতো কিছু অবকাঠামো বিদ্যমান রয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল। ট্রাম্প সেই সময় হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ‘সহজ পথে’ অথবা ‘কঠিন পথে’ গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেবে যাতে রাশিয়া বা চীন সেখানে কোনো সুযোগ না পায়। ট্রাম্পের এই হুমকির পর ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এমনকি গ্রিনল্যান্ডের রানওয়েগুলো উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল বলে খবর বেরিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই উত্তেজনা কাটিয়ে একটি পেশাদার কূটনৈতিক পথে হাটছে হোয়াইট হাউস। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাইকেল নিধামের নেতৃত্বে একটি ছোট বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই আলোচনার অগ্রগতি নিশ্চিত করছেন।
এই সম্ভাব্য সামরিক ঘাঁটিগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী সমুদ্র অঞ্চল যা সামরিক ভাষায় ‘জিআইইউকে গ্যাপ’ (GIUK Gap) নামে পরিচিত সেখানে নজরদারি বাড়ানোই যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। পেন্টাগন মনে করে এই রুটটি ব্যবহার করে রাশিয়ার সাবমেরিন এবং চীনের জাহাজগুলো আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করার চেষ্টা করতে পারে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী নতুন তিনটি ঘাঁটির মধ্যে একটি সম্ভবত নারসারসুয়াক (Narsarsuaq) নামক স্থানে অবস্থিত হতে পারে যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল। তবে একটি বিষয় নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়ে গেছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ‘সার্বভৌম ভূখণ্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে যা ডেনমার্কের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয় হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে তারা এই আলোচনার ফলাফল নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। যদিও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হয়নি তবে ডেনমার্ক সরকার এর আগে অতিরিক্ত মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়ে নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছে। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গ্রিনল্যান্ডে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিদ্যমান সামরিক ঘাঁটি থুলে (বর্তমানে পিটুফিক স্পেস বেস) সফর করেছিলেন যা অঞ্চলটির প্রতি মার্কিন আগ্রহের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল। পেন্টাগন এখন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে পুরনো ঘাঁটিগুলোকে আধুনিকায়নের দিকে বেশি জোর দিচ্ছে যাতে খরচ কমিয়ে দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করা যায়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের বিপরীতে মাইকেল নিধামের নেতৃত্বাধীন দলটি অত্যন্ত পেশাদারভাবে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। নিধাম এ পর্যন্ত ওয়াশিংটনে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত জেসপার মোলার সোরেনসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের শীর্ষ কূটনীতিক জ্যাকব ইসবোসেথসেনের সাথে অন্তত পাঁচবার বৈঠক করেছেন। এই আলোচনার সাফল্য কেবল উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না বরং ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মৈত্রী সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটাবে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেখানে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ নিয়ে পরাশক্তিগুলো ব্যস্ত সেখানে গ্রিনল্যান্ডের এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আগামী কয়েক দশকের বিশ্ব নিরাপত্তার মানচিত্র বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
