মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

কাবুলে পাকিস্তান বিমান হামলা: ২৬৯ নিহতের নেপথ্যে কি যুদ্ধাপরাধ?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

কাবুলে পাকিস্তান বিমান হামলা: ২৬৯ নিহতের নেপথ্যে কি যুদ্ধাপরাধ?

উত্তর-পশ্চিম কাবুলের একটি পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত কবরস্থানে এখন শুধুই হাহাকার। গত ১৬ মার্চ ২০২৬-এর এক বৃষ্টির রাতে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী যখন কাবুলের ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতালে বোমা বর্ষণ করে, তখন সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন কয়েক শ নিরপরাধ মানুষ। মঙ্গলবার জাতিসংঘের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই হামলায় অন্তত ২৬৯ জন বেসামরিক আফগান নাগরিক নিহত হয়েছেন। এটি আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে কারণ অনেক মৃতদেহ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে এবং অনেক শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এখন বিশ্বজুড়ে ‍‍`যুদ্ধাপরাধ‍‍` হিসেবে তদন্তের জোরালো দাবির জন্ম দিয়েছে।

মাসুদা নামের এক ২৭ বছর বয়সী তরুণী তার ২৪ বছর বয়সী ছোট ভাই মিরওয়াইসের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। মিরওয়াইস গত দশ দিন ধরে ওই নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাসুদা জানান যে তার ভাইয়ের মৃতদেহ সম্পূর্ণ পাওয়া যায়নি। কেবল শরীরের উপরের অংশ পাওয়া গিয়েছিল যা তিনি একটি জন্মদাগ দেখে শনাক্ত করেছেন। মাসুদার ভাই কোনো জঙ্গি বা যোদ্ধা ছিলেন না বরং তিনি একজন ফার্মাসিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন কিন্তু ‍‍`ট্যাবলেট-কে‍‍` নামক এক সিনথেটিক মাদকে আসক্ত হয়ে জীবন বিপন্ন করে ফেলেছিলেন। তাকে সুস্থ করে তোলার আশায় পরিবার সেখানে ভর্তি করেছিল কিন্তু পাকিস্তান সরকারের দাবি অনুযায়ী তথাকথিত ‍‍`জঙ্গি আস্তানা‍‍` ধ্বংস করার নামে সেখানে সাধারণ মানুষকেই হত্যা করা হয়েছে। মাসুদার মতো আরও ৩০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে নিহতরা সবাই ছিলেন সাধারণ রোগী অথবা হাসপাতালের সাধারণ কর্মী।

ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটি যে স্থানে অবস্থিত সেটি এক সময় মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর ব্যবহৃত ‍‍`ক্যাম্প ফিনিক্স‍‍` নামক একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল। ২০১৬ সাল থেকে এই কেন্দ্রটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল এবং এটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত পরিচিত ছিল। এমনকি ২০২৩ সালে বিবিসি এই কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে আসক্তদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিল। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি ফিওনা ফ্রেজার জানিয়েছেন যে এই কেন্দ্রটি জাতিসংঘের মূল অফিস থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সেখানে জাতিসংঘ নিয়মিত মানবিক সহায়তাও পাঠাত। ফলে পাকিস্তানের এই দাবি যে সেখানে কোনো বেসামরিক স্থাপনা ছিল না তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হচ্ছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এখনো দাবি করছে যে তারা কেবল সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে কিন্তু ওমিদ কেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী এক চিকিৎসকের বর্ণনা অনুযায়ী ওই রাতে স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে তিনটি বড় বোমা নিরাময় কেন্দ্রে আঘাত হানে। প্রথম বোমাটি একটি হ্যাঙ্গার বা বিশাল শেড লক্ষ্য করে ছোড়া হয় যেখানে নতুন রোগীদের রাখা হয়েছিল। বাকি দুটি বোমা কন্টেইনার এবং কাঠের তৈরি ব্লকগুলোতে আঘাত হানে যেখানে প্রশাসনিক দপ্তর এবং খাবার গুদাম ছিল। আগুনের লেলিহান শিখা এতই ভয়াবহ ছিল যে কাঠের তৈরি ঘরগুলো মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যায়। ওই চিকিৎসক জানিয়েছেন যে তিনি জীবনে কখনও এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখেননি যেখানে পোড়া মাংসের গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে উঠেছিল। এই হামলার ভয়াবহতা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে যারা দীর্ঘ বিশ বছরের যুদ্ধ দেখেও এমন বিশাল আকারের বেসামরিক মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেনি।

পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তীকালীন তালিবান সরকারের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইসলামাবাদ বারবার অভিযোগ করছে যে তালিবান সরকার পাকিস্তান বিরোধী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে যারা পাকিস্তান সীমান্তে হামলা চালাচ্ছে। কাবুল এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এই রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বে সাধারণ আফগান নাগরিকরাই এখন প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই হামলাকে একটি ‍‍`বেআইনি হামলা‍‍` এবং ‍‍`সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ‍‍` হিসেবে বর্ণনা করেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে নিহতদের অধিকাংশেরই মৃত্যু হয়েছে স্প্লিন্টারের আঘাত এবং মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ার কারণে। আফগানিস্তানে ক্রমবর্ধমান মাদক সমস্যার সমাধানে যারা আশার আলো খুঁজছিলেন এই বিমান হামলা তাদের সেই আশাকেই চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

নিহতদের অনেকের পরিবার এখনও তাদের প্রিয়জনের হদিস পাননি। কাবুলের সেই গণকবরটি এখন কয়েক শ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে যেখানে পাথরের স্ল্যাব দিয়ে অচিহ্নিত অবস্থায় শুয়ে আছেন ২৬৯ জন হতভাগ্য মানুষ। মোহাম্মদ আনোয়ার ওয়ালিজাদার মতো অনেক রোগী যারা মাত্র কয়েক দিন আগে সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন তারাও এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছেন। ‍‍`ট্যাবলেট-কে‍‍` মাদকের ছোবল থেকে বাঁচতে আসা এই যুবকেরা এখন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের বলি। আন্তর্জাতিক মহল এখন পাকিস্তানের কাছে এই হামলার কৈফিয়ত দাবি করছে কারণ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিরাময় কেন্দ্রকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রচার করা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ওমিদ কেন্দ্রের এই রক্তক্ষয় আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্কের তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

banner
Link copied!