মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

বিদ্রোহের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী: পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল লেবার পার্টি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

বিদ্রোহের মুখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী: পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল লেবার পার্টি

লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে আজ যে মন্ত্রিসভার বৈঠকটি চলছে, তা কেবল একটি নিয়মিত আলোচনা নয়, বরং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াই। দুই বছরেরও কম সময় আগে লেবার পার্টিকে এক বিশাল নির্বাচনী বিজয় উপহার দেওয়া এই নেতা আজ নিজের দলের ভেতরেই এক নজিরবিহীন বিদ্রোহের মুখোমুখি। গত সপ্তাহের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় এবং দলের ভেতরে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের জেরে স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন একটি সুতোর ওপর ঝুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আজকের এই বৈঠকটির ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে ব্রিটেনের আগামীর নেতৃত্বের গতিপথ।

সংকটের সূত্রপাত হয়েছে গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচন থেকে, যেখানে লেবার পার্টি ইংল্যান্ড জুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন কাউন্সিলর পদ হারিয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যখন দেখা গেছে যে ওয়েলসে দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারিয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে এবং স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল রেকর্ড করা হয়েছে। এই ভরাডুবির পর থেকেই দলের ভেতরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা আগুনে ঘি ঢেলেছে। অনেক এমপি মনে করছেন স্টারমারের বিচারবুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন জনমতের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।

আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী স্টারমারকে একটি সুনির্দিষ্ট পদত্যাগের সময়সীমা বা ‍‍`এক্সিট টাইমটেবল‍‍` তৈরির জন্য চাপ দিয়েছেন। তবে স্টারমার সরাসরি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন যে, ব্রিটেনের মানুষ এখন লেবার পার্টির কাছ থেকে ‘সুশাসন’ প্রত্যাশা করে, নেতৃত্ব নিয়ে বিশৃঙ্খলা নয়। তিনি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। স্টারমার বলেছেন, যদি কেউ মনে করেন যে তিনি নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন, তবে তারা যেন নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে চ্যালেঞ্জ জানান। লেবার পার্টির বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নেতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে অন্তত ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৮১ জন এমপির সমর্থন প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত কোনো এমপি আনুষ্ঠানিকভাবে এই সাহসী পদক্ষেপ নেননি, যদিও পর্দার আড়ালে আলোচনা তুঙ্গে।

এদিকে সরকারের ভেতর থেকে প্রথম পদত্যাগের ঘটনাটি ঘটেছে আজ সকালে। কমিউনিটি মন্ত্রী মিয়াত্তা ফাহনবুল্লেহ তার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, যা স্টারমার প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। বর্তমানে ৭০ জনেরও বেশি লেবার এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করছেন অথবা তাকে একটি বিদায়ের সময়সীমা নির্ধারণ করতে বলছেন। দলের ভেতরে বিভক্তি এখন এতটাই স্পষ্ট যে, ডাউনিং স্ট্রিটের প্রতিটি পদক্ষেপই এখন গভীর সংশয়ের মুখে। স্টারমার সোমবার একটি তড়িঘড়ি করা ভাষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে সেই পদক্ষেপটি উল্টো হিতে বিপরীত হয়েছে। ওই ভাষণের পর থেকেই এমপিবাহিনীর বিদ্রোহের সুর আরও জোরালো হয়েছে।

নেতৃত্বের এই লড়াইয়ে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বেশ কয়েকটি নাম জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারকে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের দুজনেরই দলের ভেতরে বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। এদিকে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের নামও আলোচনায় আসছে। বার্নহামের জনমোহিনী ক্ষমতা প্রশ্নাতীত হলেও তার জন্য সমস্যা হচ্ছে তিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য নন। লেবার পার্টির নেতা হতে হলে তাকে অবশ্যই এমপি হতে হবে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

লন্ডনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ক্রিস মেসনের মতে, স্টারমার এখন একটি খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন। তার টিকে থাকা নির্ভর করছে আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি কতটা দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেন তার ওপর। যদি বড় ধরনের কোনো গণপদত্যাগ ঘটে, তবে স্টারমারের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির রিফর্ম ইউকে-র ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা লেবার পার্টির কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই সন্ধিক্ষণে স্টারমার কি পারবেন ইতিহাসের ধারা পাল্টে আবারও দলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে? নাকি ডাউনিং স্ট্রিট আজই নতুন কোনো অধ্যায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে—সেই উত্তরই এখন খুঁজছে পুরো ব্রিটেন।

banner
Link copied!