যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা থেকে রক্ষা পেতে এবং নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সুরক্ষিত রাখতে ইরান তাদের বেশ কিছু সামরিক বিমান পাকিস্তানে সরিয়ে নিয়েছে। ইসলামাবাদ তেহরানকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে পাকিস্তান সরকার এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। মঙ্গলবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে অবগত বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়ে তেহরান তাদের একাধিক সামরিক উড়োজাহাজ পাকিস্তানের নূর খান বিমানঘাঁটিতে পাঠায়। রাওয়ালপিন্ডির কাছে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব উড়োজাহাজের মধ্যে ইরানি বিমানবাহিনীর একটি আরসি-১৩০ গোয়েন্দা বিমানও ছিল যা মূলত তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হয়। পেন্টাগন মনে করছে এটি ছিল ইরানের অবশিষ্ট সামরিক সম্পদ রক্ষার একটি সুচিন্তিত প্রচেষ্টা।
তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবির বিপরীতে একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছে। ইসলামাবাদ স্বীকার করেছে যে সেই সময়ে ইরানি উড়োজাহাজ পাকিস্তানে এসেছিল তবে তার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই সামরিক সুরক্ষা ছিল না। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদলকে আতিথেয়তা দিচ্ছিল। সেই আলোচনার অংশ হিসেবে কূটনৈতিক প্রতিনিধি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের প্রশাসনিক কর্মীদের পরিবহনের সুবিধার্থে ইরানি ও আমেরিকান উভয় পক্ষের বিমানই পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করেছে। পাকিস্তান এই পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করছে।
ইসলামাবাদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নূর খান ঘাঁটিতে সামরিক বিমান লুকিয়ে রাখার বিষয়টি সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে এই বিমানঘাঁটিটি অত্যন্ত জনবহুল একটি এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত এবং এখানে বড় ধরনের কোনো সামরিক উপস্থিতি গোপন রাখা কার্যত অসম্ভব। পাকিস্তান সরকারের দাবি সিবিএস নিউজ আলোচনার সদিচ্ছা এবং মধ্যস্থতার ভূমিকাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে একটি চাঞ্চল্য তৈরির চেষ্টা করছে। পাকিস্তান বর্তমানে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং বেইজিংয়ের সাথে তাদের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে চলার এক কঠিন কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
আফগানিস্তানকেও এই আলোচনায় টেনে এনেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি। সিবিএস-এর দাবি ইরান তাদের কিছু বেসামরিক উড়োজাহাজ আফগানিস্তানেও পাঠিয়েছিল যার মধ্যে মাহান এয়ারের একটি বিমান কাবুলে অবতরণ করে। পরবর্তীতে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেটিকে হেরাত বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন যে আফগানিস্তানে কোনো ইরানি সামরিক বা বিতর্কিত উড়োজাহাজ নেই। এই পুরো বিষয়টি এখন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার যুদ্ধবিরতি স্থায়িত্ব পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সিবিএস নিউজের তথ্যমতে ইরান শান্তি চুক্তির জন্য যে শর্তগুলো দিয়েছিল তার মধ্যে ছিল যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবগুলোকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থার মাঝেই পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের একাংশের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান অবশ্য তার অবস্থানে অনড় থেকে জানিয়েছে যে তারা কেবল শান্তি ও সংলাপের স্বার্থেই কাজ করছে এবং কোনো পক্ষকে সামরিক সুবিধা দিচ্ছে না।
