মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

হরমুজ প্রণালী সংকটে বিশ্ব খেলনা শিল্পে অস্থিরতা, বাড়ছে দাম

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

হরমুজ প্রণালী সংকটে বিশ্ব খেলনা শিল্পে অস্থিরতা, বাড়ছে দাম

হরমুজ প্রণালীর চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট বিশ্ব খেলনা শিল্পে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তেজনার ফলে জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্লাস্টিক ও পলিমারের দামের ওপর, যা খেলনা উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্লাস্টিক ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের দাম বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের খেলনার দাম আগামী কয়েক মাসে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতি বিশেষ করে এশিয়ার উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়। এই প্রবাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদকদের পক্ষে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিতে বাধ্য হবেন তারা। এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং ভারত তাদের খেলনা শিল্পের কাঁচামালের জন্য এই পেট্রোকেমিক্যাল আমদানির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ প্রণালীর এই সংকটে এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খেলনা উৎপাদকরা বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলে ছোট কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না, যার ফলে পুরো শিল্পটি ধীরে ধীরে কেবল বড় এবং প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন একটি সময়ে এই ধাক্কা এসেছে যখন বিশ্ব খেলনা শিল্প করোনা পরবর্তী দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে সবেমাত্র স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে শুরু করেছিল। বর্তমান সংকটের কারণে চলতি বছরে প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে রপ্তানি হ্রাস পাওয়ার এবং উৎপাদন স্থবির হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেলনা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এই সংকটের প্রধান ভুক্তভোগী হতে পারে তারা। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম গত কয়েক বছরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে নিজেদের খেলনা শিল্পকে বিশ্বদরবারে প্রসারিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও জ্বালানি সংকট এই উদীয়মান দেশগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ায় খেলনা উৎপাদনের ব্র্যান্ড তৈরির যে স্বপ্ন নিয়ে দেশগুলো কাজ করছিল, তা বর্তমান অনিশ্চয়তায় থমকে যেতে পারে। কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিও এই সংকটের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। যদিও ইউরোপের কিছু দেশ নিজেদের পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে সক্রিয়, তবুও তেল এবং প্রয়োজনীয় খনিজ পণ্যের আমদানির ওপর ইউরোপের বিশাল নির্ভরতা রয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন এবং লজিস্টিক খরচও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত খেলনার খুচরা মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর সংকট কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের খেলনা বাজার এবং ভোক্তা সাধারণের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সংকট দ্রুত নিরসন না হলে শিশুদের আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ খেলনা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।

banner
Link copied!