লামিন ইয়ামাল এখন কেবল বার্সেলোনার আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা নন, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন গাজার নিপীড়িত মানুষের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। সোমবার বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা জয়ের বর্ণাঢ্য উৎসবে ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ তুর্কি ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। রিয়াল মাদ্রিদকে এল ক্লাসিকোতে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো লিগ শিরোপা নিশ্চিত করার কয়েক ঘণ্টা পরই কাতালুনিয়ার রাজপথে নেমেছিল হাজার হাজার বার্সা ভক্ত। সেই আনন্দ মিছিলে চ্যাম্পিয়নদের ছাদখোলা বাসে দাঁড়িয়ে ইয়ামালের ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানোর দৃশ্যটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
গাজার ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনি ছাত্র মুহাম্মদ আকরাম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে অনেকের কাছে এটি কেবল একটি সাধারণ ভঙ্গি মনে হতে পারে কিন্তু গাজার মানুষের কাছে এটি ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। ইয়ামালের এই সাহসিকতাকে অত্যন্ত সাহসী ছেলের কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন ফুটবল প্রেমী ও অধিকারকর্মীরা। ইনজুরির কারণে রবিবারের ম্যাচে খেলতে না পারলেও সোমবারের এই বিজয় প্যারেডে দলের সাথে অংশ নিতে কোনো ভুল করেননি ইয়ামাল। তার এই পদক্ষেপ কেবল গাজাবাসীর হৃদয়ে নয় বরং বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান ধ্বংসলীলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনীর এই নির্মম অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যখন প্রতিবাদের ঝড় কমছে না, তখন ইয়ামালের মতো একজন বৈশ্বিক আইকনের এমন অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বার্সেলোনার প্রধান কোচ হানসি ফ্লিক মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তিনি ইয়ামালের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। ফ্লিক বলেন যে তিনি ইয়ামালকে জানিয়েছেন এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট পরিণত। এর আগে ইয়ামাল তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে নিজের ছবি পোস্ট করেন যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ মানুষ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান।
তবে ইয়ামালের এই সাহসিকতা কেবল প্রশংসাই কুড়ায়নি বরং কট্টরপন্থী ইসরায়েল সমর্থকদের তোপের মুখেও পড়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে দাবি করেছেন যে এই আচরণের জন্য ইয়ামালকে স্পেন জাতীয় দল থেকে বহিষ্কার করা উচিত এবং ব্যালন ডি অর পাওয়ার দৌড় থেকেও তাকে বাদ দেওয়া উচিত। এর বিপরীতে মানবাধিকার কর্মী নেউস টরবিস্কো ক্যাসালস ইয়ামালকে একজন সাহসী কাতালান ছেলে হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন যে যখন চুপ থাকার জন্য হাজারো চাপ থাকে তখন সত্য বলাটাই প্রকৃত সাহসিকতা। ইয়ামাল একজন মুসলিম হিসেবে এর আগেও ফুটবলে বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন।
লিওনেল মেসির পর বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে ধরা হয় এই তরুণ ফরোয়ার্ডকে। মরক্কো থেকে স্পেনে পাড়ি জমানো বাবার সন্তান ইয়ামাল সবসময়ই তার শেকড় ও ধর্মকে প্রাধান্য দিয়েছেন। বার্সার হয়ে ১০০টিরও বেশি ম্যাচে ৩০টি গোল করা এই খেলোয়াড় এখন ফিলিস্তিনিদের কাছে বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন। গাজার একজন শিক্ষার্থী হাইথাম আল মাসরি জানান যে মাত্র ১৪ সেকেন্ডের সেই ভিডিওটি দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন কারণ এটি তাদের বুঝিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে তারা এখনো গুরুত্বহীন হয়ে যাননি। ইয়ামালের এই একটি পদক্ষেপ অনেক বড় বড় রাজনৈতিক আলোচনার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
