বাস্কেটবল বিশ্বের এক সাহসী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব জেসন কলিন্স আর নেই। ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এনবিএ) ইতিহাসে প্রথম সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে সমকামী হিসেবে ঘোষণা করে ইতিহাস গড়া এই তারকা ৪৭ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। গত মঙ্গলবার তার পরিবার এক আবেগঘন বিবৃতিতে এই শোক সংবাদটি নিশ্চিত করেছে। মস্তিষ্কের এক অত্যন্ত আগ্রাসী ও বিরল ধরণের ক্যান্সার ‘গ্লিওব্লাস্টোমা’-র সাথে দীর্ঘ ও বীরত্বপূর্ণ লড়াই শেষে কলিন্স শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার পরিবার জানিয়েছে যে, তিনি ক্যান্সারের চতুর্থ ধাপের গ্লিওব্লাস্টোমায় আক্রান্ত ছিলেন এবং শেষ সময় পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।
জেসন কলিন্স কেবল একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ক্রীড়া জগতে সামাজিক পরিবর্তনের এক বড় প্রতীক। ২০১৩ সালে ‘স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড’ ম্যাগাজিনে একটি প্রথম পুরুষ প্রবন্ধে তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের বড় এক সত্য প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে তিনি উত্তর আমেরিকার চারটি প্রধান পেশাদার ক্রীড়া লীগের মধ্যে প্রথম কোনো সক্রিয় পুরুষ অ্যাথলেট হিসেবে প্রকাশ্যে নিজের সমকামী পরিচয় বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। সেই সময় তার এই সাহসী পদক্ষেপ পুরো বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে শুরু করে বাস্কেটবল দুনিয়ার রথী-মহারথীরা কলিন্সের এই সত্য প্রকাশকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং তাকে সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
৭ ফুট উচ্চতার এই সেন্টারের এনবিএ ক্যারিয়ার ছিল দীর্ঘ ১৩ বছরের। ২০০১ সালের ড্রাফটে হিউস্টন রকেটস তাকে ১৮তম চয়েস হিসেবে নির্বাচন করলেও সেই রাতেই তিনি তৎকালীন নিউ জার্সি নেটসে যোগ দেন। কলিন্স তার পেশাদার ক্যারিয়ারে মোট ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন। নিউ জার্সি নেটস ছাড়াও তিনি মেমফিস গ্রিজলিস, মিনেসোটা টিম্বারউলভস, আটলান্টা হকস, বোস্টন সেলটিকস এবং ওয়াশিংটন উইজার্ডসের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় ছিল ২০০২ এবং ২০০৩ সাল, যখন তিনি পর পর দুই বছর নেটসের হয়ে এনবিএ ফাইনাল খেলার গৌরব অর্জন করেন। মাঠে তার রক্ষণাত্মক দক্ষতা এবং সতীর্থদের প্রতি অনুপ্রেরণামূলক আচরণ তাকে সকলের প্রিয় করে তুলেছিল।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কলিন্স প্রথম জনসমক্ষে তার মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ার কথা জানান। পরবর্তীতে সেটি ক্যান্সারে রূপ নেয় এবং তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। তার মৃত্যুর পর বাস্কেটবল দুনিয়ায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কলিন্সের সাবেক এজেন্ট এবং বর্তমান ডেট্রয়েট পিস্টনসের ভাইস চেয়ারম্যান আর্ন টেলেম এক শোকবার্তায় বলেছেন যে, জেসন কলিন্স এই পৃথিবীকে যেমন পেয়েছিলেন, তার চেয়ে অনেক উন্নত অবস্থায় রেখে গেছেন। তিনি সহনশীলতা, মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তির এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে চিরকাল স্মরনীয় হয়ে থাকবেন। জেসন কলিন্সের যমজ ভাই জ্যারন কলিন্সও এনবিএ-তে খেলেছেন এবং ভাইয়ের অসুস্থতার সময় তিনি সবসময় পাশে ছিলেন।
২০১৪ সালে পেশাদার বাস্কেটবল থেকে অবসর নেওয়ার পরও কলিন্স বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনে মানবাধিকার এবং সাম্য প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তার মৃত্যুতে এনবিএ কমিশনার অ্যাডাম সিলভার এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন যে, জেসন কলিন্স কেবল একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক যিনি খেলাধুলার গণ্ডি ছাপিয়ে মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। তার অকাল প্রয়াণ বাস্কেটবল পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভক্ত ও সতীর্থরা এখন তার রেখে যাওয়া সাহসিকতার উত্তরাধিকার স্মরণ করছেন।
