ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রত্যাহার করার পর এখন গাজা উপত্যকায় হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি (ACLED) বুধবার প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে গাজায় ইসরায়েলি হামলার পরিমাণ অন্তত ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েল তাদের সমস্ত মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ অবরুদ্ধ এই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আটজন নারী এবং ১৩ জন শিশু রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় যে হারে গাজায় মানুষ মারা যাচ্ছিল, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহে সেই মৃত্যুহার ২০ শতাংশ বেড়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য গাজায় এই ক্রমবর্ধমান হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেনি।
এপ্রিলের শেষ দিকে ইসরায়েলি হামলায় নিজের এক ছেলেকে হারানো দৃষ্টিহীন ফিলিস্তিনি নাগরিক লাফি আল-নাজ্জার রয়টার্সকে তার দুর্দশার কথা জানান। তিনি বলেন যে কাগজে-কলমে বা ঘোষণায় যুদ্ধ হয়তো থেমেছে, কিন্তু মাটির বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তাদের জন্য যুদ্ধ কোনোদিন থামেনি। আল-নাজ্জারের পরিবার বর্তমানে গাজার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খান ইউনুসের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। এক সময়ের জনবহুল এই শহরটি এখন কেবল ইট-পাথরের স্তূপে পরিণত হয়েছে।
গাজার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ কিছুটা সরে যাওয়ায় ইসরায়েল সেই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েছে। বর্তমানে গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে দক্ষিণের রাফাহ সীমান্ত পর্যন্ত প্রতিটি এলাকায় বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসিএলইডি-র রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে এপ্রিল মাসে ইসরায়েল গাজায় ড্রোন ও ভারী কামানের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে যা মূলত সাধারণ মানুষের বসতি লক্ষ্য করেই চালানো হচ্ছে।
ইসরায়েলের এই দুই বছরের দীর্ঘ অভিযানকে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই এখন `গণহত্যা` হিসেবে অভিহিত করছেন। যদিও গত বছরের অক্টোবর থেকে একটি নামমাত্র যুদ্ধবিরতির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে গাজার প্রতিটি পরিবার এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবের পাশাপাশি আকাশ থেকে প্রতিনিয়ত ঝরে পড়া বোমার আঘাত ফিলিস্তিনিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে যে এভাবে হামলা বাড়তে থাকলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
