লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সাথে দক্ষিণ অঞ্চলের সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে বুধবার বৈরুত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে জিয়েহ এলাকায় তিনটি পৃথক গাড়ি লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। নিহতদের মধ্যে দুইজন শিশু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে যে মহাসড়কের ওপর থাকা গাড়িগুলো বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে এবং আগুনের লেলিহান শিখায় সেগুলোর বহিরাবরণ পুরোপুরি পুড়ে কালো হয়ে গেছে। এই ঘটনার পর ওই অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
দক্ষিণ লেবাননের টায়ার এলাকা থেকে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে এই সংঘাত এখন কেবল তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার হার বাড়ছে যা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই হামলার সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল কারণ বৃহস্পতিবারই ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যস্থতায় লেবানন ইস্যুতে নতুন করে সরাসরি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ এই আলোচনার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি অনুযায়ী ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল অংশ দখল করে আছে এবং সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।
এদিকে বুধবার সকালেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ছয়টি গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য নতুন করে উচ্ছেদ আদেশ জারি করেছে। মেইস আল-জাবাল, ইয়ানুহ, বুর্জ শেমালি, হুলা, দেবল এবং আব্বাসিয়াহ এলাকার বাসিন্দাদের বলা হয়েছে তারা যেন অন্তত এক হাজার মিটার বা এক কিলোমিটার দূরে খোলা স্থানে সরে যায়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সতর্ক করে জানিয়েছে যে এই গ্রামগুলোতে তারা অতি শীঘ্রই অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে। যারা সেখানে অবস্থান করবে তারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করবে বলে ওই আদেশে জানানো হয়েছে। প্রতিদিনের এই উচ্ছেদ আদেশের ফলে লেবাননের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মানবিক বিপর্যয়ের এই চিত্র আরও প্রকট হয়ে উঠেছে যখন দেখা যাচ্ছে যে উচ্ছেদ আদেশের আওতাভুক্ত এলাকায় টায়ার জেলার অবশিষ্ট তিনটি হাসপাতালের একটি অবস্থিত। ওই অঞ্চলে এখনো অন্তত এক লাখ মানুষ বসবাস করছেন যাদের জন্য এই হাসপাতালগুলোই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু মহাসড়কে ক্রমাগত হামলা এবং উচ্ছেদ আদেশের ফলে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে গত মার্চের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি অভিযানে অন্তত ২৮০০ জন নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবারও দক্ষিণাঞ্চলীয় বিভিন্ন শহরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন যার মধ্যে দুইজন প্যারামেডিক বা চিকিৎসাকর্মী ছিলেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য খাতের ওপর হামলার অভিযোগও বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৮ জন জরুরি চিকিৎসাকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিহত হয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপর ১৪০টিরও বেশি হামলা রেকর্ড করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতিকে একটি বড় মানবিক সংকট হিসেবে অভিহিত করছে। বর্তমানে লেবাননে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী শিবিরে বসবাস করছেন। ওয়াশিংটনের আলোচনা যখন শুরুর পথে ঠিক তখনই বেসামরিক মানুষের ওপর ড্রোন হামলার এই ঘটনা সংকট নিরসনের পথকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
