রাশিয়া তাদের পারমাণবিক শক্তি আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত মঙ্গলবার আরএস-২৮ সারমাট নামক এই ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করেন এবং একে `বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র` হিসেবে অভিহিত করেন। এই পরীক্ষাটি এমন এক সময়ে চালানো হলো যখন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট নিয়ে ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। পুতিনের দাবি অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা এবং ধ্বংসক্ষমতা পশ্চিমা বিশ্বের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি।
সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রটি পশ্চিমা বিশ্বে `শয়তান ২` (Satan II) নামে পরিচিত। এটি মূলত সোভিয়েত আমলের পুরনো ভোয়েভোদা (Voyevoda) ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হবে। পুতিনের দেওয়া তথ্যমতে, সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩৫,০০০ কিলোমিটারের বেশি, যা প্রায় পৃথিবীর একটি পূর্ণ আবর্তনের সমান। অর্থাৎ এটি রাশিয়ার মাটি থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৮,০০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি বলে মনে করে। পাল্লার ব্যবধান যাই হোক না কেন, এটি যেকোনো আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম বলে মস্কো দাবি করেছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে সারমাট অত্যন্ত উন্নত। এটি ৩৫.৩ মিটার লম্বা এবং এর ওজন প্রায় ২০৮ টন। এটি একসাথে ১০টি বড় বা ১৬টি ছোট পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের পর খুব দ্রুত উচ্চগতি অর্জন করে, যা শত্রুপক্ষের রাডার ব্যবস্থাকে এটি শনাক্ত করার জন্য খুব সামান্য সময় দেয়। এছাড়া এটি সাব-অরবিটাল বা উপ-কক্ষপথ দিয়ে উড়তে সক্ষম হওয়ায় উত্তর বা দক্ষিণ মেরু যেকোনো দিক দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। ২০১১ সাল থেকে এর কাজ শুরু হলেও একাধিকবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একটি পরীক্ষা চলাকালীন সিলোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে এবারের সফল পরীক্ষার পর পুতিন ঘোষণা করেছেন যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ সারমাট আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ বাহিনীর কমান্ডে যুক্ত হবে। রাশিয়ার ক্রাসনোয়ারস্ক অঞ্চলে প্রথম সারমাট রেজিমেন্ট মোতায়েন করা হবে বলে জানা গেছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার মন্থর অগ্রগতি এবং পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার অস্ত্র দেওয়ার পাল্টা জবাব হিসেবেই পুতিন এই পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শন করছেন। এছাড়া ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর রাশিয়ার এই পরীক্ষা বিশ্ব রাজনীতিতে মস্কোর প্রভাব ধরে রাখার একটি কৌশল। সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রের এই সফল উৎক্ষেপণ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে নতুন করে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
